বাদ্যযন্ত্র: নীরব এক আত্মা, জাগরণের আরাধ্য দেবতা-- তাপস কুমার পাল।

বাদ্যযন্ত্র: নীরব এক আত্মা, জাগরণের আরাধ্য দেবতা
-- তাপস কুমার পাল
৩০/০৭/২০২৫


বাদ্যযন্ত্র — বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় কেবল কাঠ, তার আর ধাতুর সংমিশ্রণ। নীরব, নিস্তব্ধ, অনুভূতিহীন, অনুভবহীন এক বস্তু। কিন্তু সত্যিই কি সে বোবা? কিন্তু শিল্পীর চোখে সে কেবল এক বস্তু নয়, সে এক আত্মা। যেন এক ঘুমন্ত দেবতা, যাকে জাগাতে হয় মনের গভীর আর্তি দিয়ে, সুরের সাধনায়, সুরের ছোঁয়ায়, হৃদয়ের তীব্রতম কম্পনে।

একটি সেতার, একটি তবলা, একটি বেহালা — যতক্ষণ না শিল্পী তার প্রাণ ছুঁয়ে দেয়, ততক্ষণ তারা নিঃসাড়, প্রাণহীন। বাদ্যযন্ত্র যন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে আছে — চুপচাপ, নিঃশব্দে। যেন প্রশ্ন করে, "আজ তুমি আমাকে কেমন জাগাবে?"
কিন্তু একবার যদি শিল্পী  অন্তর থেকে তাকে ছুঁয়ে দেয়, তার আঙুলে যদি ভালোবাসার কম্পন জেগে ওঠে, তবে সেই বোবা বস্তু যেন প্রাণ পায়। তার নিরবতা ভেঙে যায় সুরের ভাষায়। তখন সেই সুর শুধু সঙ্গীত হয় না — হয়ে ওঠে আত্মার ভাষা, যে ভাষায় মানুষ কাঁদে, ভাবে, ডুবে যায়।

সে সুর শিল্পী একা  শোনেন  না — শুনে ফেলে অন্য কেউ, যার মন আজ ভারাক্রান্ত। শুনে ফেলে সেই মানুষ, যার হৃদয়ে একাকিত্ব গুমরে কাঁদে। তখন বোবা যন্ত্র হয়ে ওঠে সবার ভাষা। তখন বোবা বেহালা কাঁদে, কিন্তু তার কান্না আনন্দ দেয়, বেদনা সান্ত্বনা হয়ে ওঠে।

বাদ্যযন্ত্রকে জাগাতে হয় — ঠিক যেমন পূজার আগেই মূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়। সে কেবল বাজানোর বস্তু নয়, সে সাধনার সাথি, অনুভবের দোসর, জীবনের একান্ত সঙ্গী, সুরই আমার প্রার্থনা। সাধনা আমার আঙুলে, এবং ভক্তি আমার করতলে। যে যন্ত্র নীরব, তাকে আমি জাগাই — সেই জাগরণে কখনও কান্না আসে, কখনও আলো।

তাই তো বাদ্যযন্ত্র কোনো যন্ত্র নয়, সে এক আত্মা। তাকে অনুভব করতে হয়, তার সামনে নিজেকে সঁপে দিতে হয়। আর তখনই বোঝা যায় — নীরবতারও একটি সুর আছে, এবং সেই সুরই আমাদের অন্তরকে জাগিয়ে তোলে।

পরিশেষে এটুকুই বলা, "সঙ্গীতের কাছে আমরা সকলেই বোবা" — তবুও সুরই আমাদের করে তোলে মানুষের মতো অনুভবী,আর বাদ্যযন্ত্র — একেবারে নীরব থেকেও শিখিয়ে দেয় কেমন করে নিঃশব্দে ভালোবাসতে হয়।

Comments

Popular posts from this blog

একক বাদনের সুরে স্মরণে পণ্ডিত ভি. জি. যোগ

বৌদ্ধ মূর্তিতে কোঁকড়ানো চুলের রহস্য

টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার — কবিতা ও সঙ্গীত