সুরের সাধনায় এক দশক : অনুরণনের শাস্ত্রীয় আখ্যান



এক দশক আগে বিশ্বখ্যাত তবলা শিল্পী পণ্ডিত পরিমল চক্রবর্তী ও তাঁর সহধর্মিণী শ্রীমতি সুতপা চক্রবর্তী-র নেতৃত্বে অনুরণন - এর দশম বার্ষিকীর অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠিত হলো যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ডঃ ত্রিগুণা সেন অডিটোরিয়ামে।এই সংস্থার বৈশিষ্ট্য হলো নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান শিল্পী ও প্রতিষ্ঠিত গুরুদের একত্রে মঞ্চস্থ করা। এবারের অনুষ্ঠানে এই ভাবনাই যেন স্পষ্ট হয়ে উঠল প্রতিটি পরিবেশনায়।

🎼 অনুষ্ঠানের প্রথম পরিবেশনা: দ্বৈত তবলা - গুরুপ্রেমের প্রতিধ্বনি

শিল্পী: পরাগ চৌধুরী ও ঋতুরাজ মিত্র
সহযোগী: সুব্রত ভট্টাচার্য (হারমোনিয়াম)

দ্বৈত তবলা পরিবেশনায় পণ্ডিত পরিমল চক্রবর্তীর দুই সুযোগ্য ছাত্র পরাগ চৌধুরী ও ঋতুরাজ মিত্র মুগ্ধ করলেন শ্রোতৃমণ্ডলিকে। পেশকার, কায়দা, রেলা, টুকরা, গৎ, পড়ন এবং চক্রধার বাজনায় গুরুর তালিম ও ছায়া যেন স্পষ্ট হয়ে ধরা দিল। হারমোনিয়ামে সুব্রত ভট্টাচার্য তাঁদের বাজনাকে আরো উজ্জ্বল করে তোলেন অনবদ্য সঙ্গতে।

🎻 দ্বিতীয় পরিবেশনা: তরুণ সরোদ শিল্পীর সুরে রাগ বিহাগ

শিল্পী: স্বর্ণেন্দু মন্ডল
তবলা সহযোগী: নবারুণ দত্ত

স্বর্ণেন্দু মন্ডল রাগ বেহাগ পরিবেশনে তাঁর গভীর তালিম, রেওয়াজ ও সূক্ষ্ম সংগীতভাবনার পরিচয় দিলেন। বিশেষ করে তান ও লয়ের বিন্যাস ছিল প্রশংসনীয়। তবলায় নবারুণ দত্ত দারুণ সংযত ও মনোযোগী সঙ্গত দিয়ে স্বর্ণেন্দুকে প্রতিটি পর্যায়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন।

🎤 তৃতীয় পরিবেশনা: কণ্ঠে রাগ পুরিয়া ও ঠুমরি

শিল্পী: শ্রীমতি সোহিনী মজুমদার
তবলা: অমিতাভ সেন
হারমোনিয়াম: সুব্রত ভট্টাচার্য

সোহিনী মজুমদার রাগ পুরিয়াতে তাঁর রেওয়াজ ও ভাবনাকে এমনভাবে মিশিয়েছিলেন, যা শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। পরে দেশ রাগে পরিবেশিত ঠুমরিতেও তাঁর সুর ও অভিব্যক্তি মন জয় করে নেয়। তবলায় অমিতাভ সেন এবং হারমোনিয়ামে আবারো সুব্রত ভট্টাচার্য এক অনবদ্য সঙ্গত প্রদান করেন।


🌟 শেষ পরিবেশনা: সন্তুর ও তবলার অপূর্ব মিলন
চিত্র -পণ্ডিত পরিমল চক্রবর্তী 
চিত্র - পণ্ডিত সন্দীপ চ্যাটার্জি 


শিল্পী: পণ্ডিত সন্দীপ চ্যাটার্জি (সন্তুর), পণ্ডিত পরিমল চক্রবর্তী (তবলা)

অনুষ্ঠানের সর্বশেষ ও মুখ্য আকর্ষণ ছিল দুই প্রখ্যাত শিল্পীর যুগলবন্দী। রাগ বাগেশ্রী-র এক সংক্ষিপ্ত আলাপের পর ঝাঁপ তালে গৎ ধরেন সন্তুরে। পণ্ডিত পরিমল চক্রবর্তীর তবলা শুরু হতেই দুই যন্ত্রের মধ্যে যেন এক অলৌকিক সংলাপ শুরু হয়। তাঁদের লয়ের বোধ, তাল খেলায় তেহাইয়ের কারুকার্য এবং তিনতাল ঝালা পর্যায়ে "না ধিন ধিন্না"-র অনুপম পরিবেশনা শ্রোতারা দীর্ঘদিন মনে রাখবে।

🎙️ সঞ্চালনা
চিত্র- শিঞ্জিনী চক্রবর্তী 

সার্বিক অনুষ্ঠানটি সুচারুভাবে পরিচালনা করেন শিঞ্জিনী চক্রবর্তী।


🌧️ বৃষ্টিতে ভিজে শাস্ত্রীয় সুরের জয়


অনুষ্ঠান চলাকালীন কলকাতা শহর ছিল প্রায় জলের তলায়। কিন্তু সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিও প্রেক্ষাগৃহের শ্রোতাদের উচ্ছ্বাসকে দমাতে পারেনি। বরং শ্রোতাদের সংখ্যা এতটাই বেশি ছিল যে, অনেককে দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে হয়েছে। এ এক নিঃসন্দেহে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের জয় — শ্রোতাদের হৃদয়ে, সুরের প্রতি ভালোবাসায়।

প্রতিবেদন: তাপস কুমার পাল।


Comments

Popular posts from this blog

একক বাদনের সুরে স্মরণে পণ্ডিত ভি. জি. যোগ

বৌদ্ধ মূর্তিতে কোঁকড়ানো চুলের রহস্য

টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার — কবিতা ও সঙ্গীত