আফগানিস্তানে হিন্দু দেবতা গণেশ পুজো : এক বিস্মৃত ইতিহাস
আফগানিস্তানে হিন্দু দেবতা
গণেশ পুজো : এক বিস্মৃত ইতিহাস
©®প্রতিবেদনে - তাপস কুমার পাল
ভারতীয় সভ্যতার বিস্তার ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির প্রভাব কেবল গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। খ্রিস্টীয় ৯৬০ সালের পূর্বে আফগানিস্তান, ভাংকু নদী এবং তারও বহু দূরবর্তী অঞ্চলে ভারতীয় সংস্কৃতির আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। এই অঞ্চল দীর্ঘকাল ধরে ভারতীয় সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈতরণী হিসেবে পরিচিত ছিল। মধ্য এশিয়া থেকে আগত উপজাতিরা প্রথমে আফগানিস্তানে বসতি স্থাপন করত, পরে ধীরে ধীরে ভারতীয় ধর্ম–সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে শেষে ভারতে প্রবেশ করত।
গ্রীক, শক, পাহলব, কুষাণ ও হুন— প্রত্যেকে আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালালেও ভারতীয় বহুত্ববাদী সংস্কৃতির অনন্য শক্তির কারণে একসময়ে তারা আত্মস্থ হয়ে যেত। আফগানিস্তানেও বহু দেব–দেবীর উপাসনা প্রচলিত ছিল, যা মুসলমানদের একেশ্বরবাদী মতের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। উপজাতিরা একে অপরের দেবতাকে সম্মান জানাত এবং ভিন্ন ভিন্ন পুজো-আচ্চাই বা আচার মেনে চলত।
বিভিন্ন উপজাতির হিন্দু উপাসনা
ক. পাঠান বা পাখতরা
প্রাচীন আর্যদের নিকটাত্মীয় এই উপজাতি অশ্বিনী কুমারদের পুজো করত। Rigveda–তে উল্লিখিত অশ্বিনী কুমারদের সঙ্গে পাঠানদের সাদৃশ্য খুঁজে পান বহু ঐতিহাসিক।
খ. কাশ্মীর থেকে আগত উপজাতি
তাদের সম্পর্কে ঐতিহাসিক নথিতে বলা হয়েছে, এরা কাঁচা মাংস ভক্ষণকারী ও ভ্যাম্পায়ারসদৃশ স্বভাবের ছিল। তারা শিবের লিঙ্গরূপ পুজো করত এবং আজকের লঘমান অঞ্চলে বসবাস করত। উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই উপজাতি মাত্র ১৫০ বছর আগে ইসলাম গ্রহণ করেছে।
(সূত্র: George Morgenstierne, Report on a Linguistic Mission to Afghanistan, 1926)
গণেশ পুজো : এক বিস্মৃত ইতিহাস
©®প্রতিবেদনে - তাপস কুমার পাল
ভারতীয় সভ্যতার বিস্তার ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির প্রভাব কেবল গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। খ্রিস্টীয় ৯৬০ সালের পূর্বে আফগানিস্তান, ভাংকু নদী এবং তারও বহু দূরবর্তী অঞ্চলে ভারতীয় সংস্কৃতির আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। এই অঞ্চল দীর্ঘকাল ধরে ভারতীয় সভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈতরণী হিসেবে পরিচিত ছিল। মধ্য এশিয়া থেকে আগত উপজাতিরা প্রথমে আফগানিস্তানে বসতি স্থাপন করত, পরে ধীরে ধীরে ভারতীয় ধর্ম–সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে শেষে ভারতে প্রবেশ করত।
গ্রীক, শক, পাহলব, কুষাণ ও হুন— প্রত্যেকে আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালালেও ভারতীয় বহুত্ববাদী সংস্কৃতির অনন্য শক্তির কারণে একসময়ে তারা আত্মস্থ হয়ে যেত। আফগানিস্তানেও বহু দেব–দেবীর উপাসনা প্রচলিত ছিল, যা মুসলমানদের একেশ্বরবাদী মতের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। উপজাতিরা একে অপরের দেবতাকে সম্মান জানাত এবং ভিন্ন ভিন্ন পুজো-আচ্চাই বা আচার মেনে চলত।
বিভিন্ন উপজাতির হিন্দু উপাসনা
ক. পাঠান বা পাখতরা
প্রাচীন আর্যদের নিকটাত্মীয় এই উপজাতি অশ্বিনী কুমারদের পুজো করত। Rigveda–তে উল্লিখিত অশ্বিনী কুমারদের সঙ্গে পাঠানদের সাদৃশ্য খুঁজে পান বহু ঐতিহাসিক।
খ. কাশ্মীর থেকে আগত উপজাতি
তাদের সম্পর্কে ঐতিহাসিক নথিতে বলা হয়েছে, এরা কাঁচা মাংস ভক্ষণকারী ও ভ্যাম্পায়ারসদৃশ স্বভাবের ছিল। তারা শিবের লিঙ্গরূপ পুজো করত এবং আজকের লঘমান অঞ্চলে বসবাস করত। উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই উপজাতি মাত্র ১৫০ বছর আগে ইসলাম গ্রহণ করেছে।
(সূত্র: George Morgenstierne, Report on a Linguistic Mission to Afghanistan, 1926)
©® ✍️ তাপস কুমার পাল
গ. নুরিস্তানের আর্য পাঠান
কালো পোশাক পরিহিত যোদ্ধা হিসেবে খ্যাত এরা ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত মুসলমান আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। তারা যমরাজের পূজারি ছিল।
(সূত্র: R.C. Majumdar, The History and Culture of the Indian People, Vol. II)
ঙ. শক বা সিথিয়ান
শক অশ্বারোহী উপজাতির শক্তি পশ্চিমে সৌরাষ্ট্র থেকে পূর্বে মগধ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তারা সূর্য উপাসক ছিল এবং তাদের থেকেই ছট উৎসব–এর প্রচলন বলে মনে করা হয়।
(সূত্র: Romila Thapar, Early India)
চ. কুষাণ
কুষাণ রাজারা ছিলেন শিব, বুদ্ধ ও ইরানি দেবী নানা–র ভক্ত। ভারতে তাঁকে নৈনা দেবী নামে পুজো করা হতো।
(সূত্র: A.L. Basham, The Wonder That Was India)
ছ. জানজুয়া উপজাতি
হিন্দু শাহী রাজারা জানজুয়া সম্প্রদায় থেকে এসেছিলেন। তারা শিব, পার্বতী ও দুর্গার পূজারি ছিলেন।
(সূত্র: André Wink, Al-Hind: The Making of the Indo-Islamic World)
উপরের ছবিতে প্রদর্শিত হলো Gardez Ganesha—আফগানিস্তানের গার্দেজ এলাকা থেকে উদ্ধার করা সাদা মার্বেলের গণেশ মূর্তি, যা পরবর্তীতে কাবুলের Dargah Pir Rattan Nath মন্দিরে স্থানান্তরিত হয়েছিল ।
©® ✍️ তাপস কুমার পাল
খিলজি তুর্ক ও গণেশ পুজো
খিলজিদের আমরা সাধারণত মুসলমান রাজবংশ হিসেবে জানলেও, তাঁদের প্রাথমিক পরিচয় ছিল ভিন্ন। খিলজি তুর্করা সূর্যদেব (ভগবান জুর)–এর পূজারি ছিলেন। আশ্চর্যজনকভাবে তাঁরা ভগবান গণেশের প্রতিও গভীর ভক্তি প্রকাশ করতেন।
আজকের কলশ জনগোষ্ঠীকে খিলজিদের উত্তরসূরি বলে মনে করা হয়। আফগানিস্তানের গার্দেজ প্রদেশ থেকে প্রাপ্ত একখানি সাদা মার্বেলের গণেশমূর্তি বর্তমানে কাবুল মিউজিয়াম–এ সংরক্ষিত আছে। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, খিলজি তুর্ক রাজা মহারাজ খিঞ্জিল ভগবান গণেশের ভক্ত ছিলেন।
(সূত্র: J. Hackin, Recherches Archéologiques à Begram et à Bamiyan, 1933; Archaeological Survey of India Reports, 20th Century)
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
৬৫৩ থেকে ৯৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরব মুসলমানরা আফগানিস্তানের হিন্দু পাঠান ও হিন্দু তুর্কদের জয় করতে পারেনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে হঠাৎ করেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটে এবং মুসলিম শাসকরা আফগানিস্তান অতিক্রম করে সরাসরি সোমনাথ মন্দির পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
ইতিহাসবিদদের মতে এই দ্রুত পরিবর্তনের আসল কারণ এখনও সম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়। তবে এটা স্পষ্ট যে, বহুত্ববাদী ও হিন্দু–বৌদ্ধ উপাসনায় ভরপুর আফগানিস্তান ধীরে ধীরে ইসলামের কঠোর একেশ্বরবাদী রূপে গ্রাসিত হয়ে যায়।
পরিশেষে, আফগানিস্তান শুধু আক্রমণকারীদের প্রবেশপথই ছিল না, বরং ভারতীয় বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক মহান কেন্দ্র ছিল। পাঠান, শক, কুষাণ, জানজুয়া কিংবা খিলজি— সকলে কোনো না কোনোভাবে হিন্দু দেবতার পূজা করেছে।
বিশেষত খিলজি তুর্কদের গণেশপূজার ঘটনা আমাদের চোখে আনে ভারতীয় সংস্কৃতির বিস্মৃত অধ্যায়। এটি প্রমাণ করে ভারতীয় সভ্যতার প্রভাব সীমাহীন ও সর্বজনীন ছিল। আজ যখন আফগানিস্তান শুধুই যুদ্ধ ও ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে আলোচিত, তখন এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়— একসময় এই ভূখণ্ডও ছিল দেবতা, উৎসব ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির উর্বর ভূমি।
©® ✍️ তাপস কুমার পাল
গ. নুরিস্তানের আর্য পাঠান
কালো পোশাক পরিহিত যোদ্ধা হিসেবে খ্যাত এরা ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত মুসলমান আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। তারা যমরাজের পূজারি ছিল।
(সূত্র: R.C. Majumdar, The History and Culture of the Indian People, Vol. II)
ঙ. শক বা সিথিয়ান
শক অশ্বারোহী উপজাতির শক্তি পশ্চিমে সৌরাষ্ট্র থেকে পূর্বে মগধ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তারা সূর্য উপাসক ছিল এবং তাদের থেকেই ছট উৎসব–এর প্রচলন বলে মনে করা হয়।
(সূত্র: Romila Thapar, Early India)
চ. কুষাণ
কুষাণ রাজারা ছিলেন শিব, বুদ্ধ ও ইরানি দেবী নানা–র ভক্ত। ভারতে তাঁকে নৈনা দেবী নামে পুজো করা হতো।
(সূত্র: A.L. Basham, The Wonder That Was India)
ছ. জানজুয়া উপজাতি
হিন্দু শাহী রাজারা জানজুয়া সম্প্রদায় থেকে এসেছিলেন। তারা শিব, পার্বতী ও দুর্গার পূজারি ছিলেন।
(সূত্র: André Wink, Al-Hind: The Making of the Indo-Islamic World)
উপরের ছবিতে প্রদর্শিত হলো Gardez Ganesha—আফগানিস্তানের গার্দেজ এলাকা থেকে উদ্ধার করা সাদা মার্বেলের গণেশ মূর্তি, যা পরবর্তীতে কাবুলের Dargah Pir Rattan Nath মন্দিরে স্থানান্তরিত হয়েছিল ।
©® ✍️ তাপস কুমার পাল
খিলজি তুর্ক ও গণেশ পুজো
খিলজিদের আমরা সাধারণত মুসলমান রাজবংশ হিসেবে জানলেও, তাঁদের প্রাথমিক পরিচয় ছিল ভিন্ন। খিলজি তুর্করা সূর্যদেব (ভগবান জুর)–এর পূজারি ছিলেন। আশ্চর্যজনকভাবে তাঁরা ভগবান গণেশের প্রতিও গভীর ভক্তি প্রকাশ করতেন।
আজকের কলশ জনগোষ্ঠীকে খিলজিদের উত্তরসূরি বলে মনে করা হয়। আফগানিস্তানের গার্দেজ প্রদেশ থেকে প্রাপ্ত একখানি সাদা মার্বেলের গণেশমূর্তি বর্তমানে কাবুল মিউজিয়াম–এ সংরক্ষিত আছে। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, খিলজি তুর্ক রাজা মহারাজ খিঞ্জিল ভগবান গণেশের ভক্ত ছিলেন।
(সূত্র: J. Hackin, Recherches Archéologiques à Begram et à Bamiyan, 1933; Archaeological Survey of India Reports, 20th Century)
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
৬৫৩ থেকে ৯৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরব মুসলমানরা আফগানিস্তানের হিন্দু পাঠান ও হিন্দু তুর্কদের জয় করতে পারেনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে হঠাৎ করেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। ইসলামী সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটে এবং মুসলিম শাসকরা আফগানিস্তান অতিক্রম করে সরাসরি সোমনাথ মন্দির পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
ইতিহাসবিদদের মতে এই দ্রুত পরিবর্তনের আসল কারণ এখনও সম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়। তবে এটা স্পষ্ট যে, বহুত্ববাদী ও হিন্দু–বৌদ্ধ উপাসনায় ভরপুর আফগানিস্তান ধীরে ধীরে ইসলামের কঠোর একেশ্বরবাদী রূপে গ্রাসিত হয়ে যায়।
পরিশেষে, আফগানিস্তান শুধু আক্রমণকারীদের প্রবেশপথই ছিল না, বরং ভারতীয় বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক মহান কেন্দ্র ছিল। পাঠান, শক, কুষাণ, জানজুয়া কিংবা খিলজি— সকলে কোনো না কোনোভাবে হিন্দু দেবতার পূজা করেছে।
বিশেষত খিলজি তুর্কদের গণেশপূজার ঘটনা আমাদের চোখে আনে ভারতীয় সংস্কৃতির বিস্মৃত অধ্যায়। এটি প্রমাণ করে ভারতীয় সভ্যতার প্রভাব সীমাহীন ও সর্বজনীন ছিল। আজ যখন আফগানিস্তান শুধুই যুদ্ধ ও ধ্বংসের প্রতীক হিসেবে আলোচিত, তখন এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়— একসময় এই ভূখণ্ডও ছিল দেবতা, উৎসব ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির উর্বর ভূমি।
©® ✍️ তাপস কুমার পাল
Comments