নি নিয়োমান ক্যান্দ্রি এবং আরজা নৃত্য - তাপস কুমার পাল

 নি নিয়োমান ক্যান্দ্রি এবং আরজা নৃত্য

প্রতিবেদনে - তাপস কুমার পাল


মানবজীবনে বয়স কেবল সংখ্যা নয়, বরং অভিজ্ঞতার এক মূল্যবান ভাণ্ডার। ষাটের দশকে প্রবেশ করলে বিশেষত নারীদের শরীরে নানা পরিবর্তন দেখা যায়—হাড়ের দুর্বলতা, জয়েন্টে ব্যথা, হৃদরোগের ঝুঁকি, ঘুম ও স্মৃতিশক্তি সমস্যা প্রভৃতি। শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অনেকেই জীবন ও কর্মে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের কিংবদন্তি শিল্পী নি নিয়োমান ক্যান্দ্রি (Ni Nyoman Candri) তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। বয়স যখন ১০৬ বছর, তখনও তিনি বালির ঐতিহ্যবাহী আরজা নৃত্য-নাটকের অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন।

©®তাপসকুমারপাল



ষাটের দশকের মহিলাদের সাধারণ শারীরিক সমস্যা

ষাটের পর নারীদের শরীরে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটে, যা শারীরিক সক্ষমতা ও জীবনের মানকে প্রভাবিত করে।

• পেশী ও কঙ্কালের সমস্যা: হাড় ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া (অস্টিওপোরোসিস), জয়েন্টে ব্যথা ও অস্টিওআর্থারাইটিস, পেশী ক্ষয়।

• হৃদরোগজনিত ঝুঁকি: উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও ডায়াবেটিস হৃদরোগের আশঙ্কা বাড়ায়।

• মূত্রাশয় সমস্যা: প্রস্রাবের অসংযম বা অতিরিক্ত চাপ।

• ইন্দ্রিয়ের পরিবর্তন: শ্রবণশক্তি কমে যাওয়া, ছানি, দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতা।

• ত্বক ও চুল: বলিরেখা, দাগ ও শুষ্কতা।

• বিপাক ও হজম: ধীর বিপাকের কারণে ওজন বৃদ্ধি ও কোষ্ঠকাঠিন্য।

• ঘুম ও স্মৃতিশক্তি: অনিদ্রা, হালকা জ্ঞানীয় দুর্বলতা।

তবে এর মাঝেই কিছু মানুষ নিজের আবেগ, অনুশীলন ও শৃঙ্খলা দিয়ে বার্ধক্যকে জয় করেন। নি নিয়োমান ক্যান্দ্রি (Ni Nyoman Candri) তারই এক অনন্য উদাহরণ।
©®তাপসকুমারপাল

নি নিয়োমান ক্যান্দ্রি(Ni Nyoman Candri) -র জীবন ও পথচলা

নি নিয়োমান ক্যান্দ্রি জন্মেছিলেন ১৯১৯ সালে, বালির সিঙ্গাপাডু গ্রামে। শিল্পমুখর পরিবারে বেড়ে ওঠা ক্যান্দ্রি ছোটবেলা থেকেই বাবার কাছে আরজা নৃত্যের শিক্ষা গ্রহণ করেন। বয়সের সাথে সাথে তাঁর প্রতিভা প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে এবং তিনি হয়ে ওঠেন বালির সবচেয়ে জনপ্রিয় আরজা শিল্পী।


নি নিয়োমান ক্যান্দ্রি(Ni Nyoman Candri) -র  ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য দিক-

• আরজার কনডং বা দাসীর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি বিশেষভাবে বিখ্যাত।

• শিক্ষাদান: নতুন প্রজন্মকে আরজা নৃত্যে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, এখনও দিচ্ছেন।

• আন্তর্জাতিক খ্যাতি: জাপান, নিউ ইয়র্ক, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি ও ব্রাজিলে পরিবেশনার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে বালির সাংস্কৃতিক দূত হয়ে উঠেছেন।

• সম্প্রদায়ের কাজ: সামাজিক কর্মকাণ্ড ও বানজার কাউন্সিল এর প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেছেন।

আজও, শতবর্ষ ছাড়ানো বয়সে তিনি কেবল শিল্পী নন, বরং এক সংস্কৃতির প্রতীক।


©®তাপসকুমারপাল



"আরজা" নৃত্যের ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য

আরজা নৃত্য-নাটক বালির একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, যার সূচনা হয়েছিল ১৮শ শতকে।

বৈশিষ্ট্য

• নৃত্য, সংগীত ও নাটকের সংমিশ্রণ।

• চোখ, হাত ও মুখের সূক্ষ্ম অঙ্গভঙ্গি।

• চরিত্র: রাজা, রানি, দাসী (কনডং), বিদূষক ইত্যাদি।

• ঐতিহ্যবাহী পোশাক, গয়না ও মুখোশের ব্যবহার।

• গ্যামেলান অর্কেস্ট্রার সুরে পরিবেশনা।

কাহিনি

আরজার গল্পে পৌরাণিক কাহিনি, লোকগাথা, প্রেমকাহিনি ও সামাজিক ব্যঙ্গচিত্র সমানভাবে স্থান পায়। ফলে এটি শুধু বিনোদন নয়, বরং সমাজজীবনের প্রতিচ্ছবি।

সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

• ঐতিহ্যের ধারক: বালির সাংস্কৃতিক শিকড়কে বাঁচিয়ে রেখেছে।

• সামাজিক বন্ধন: মন্দির উৎসব, বিয়ে বা গ্রামীণ অনুষ্ঠানে মানুষকে একত্র করে।

• বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি: আরজা এখন আন্তর্জাতিক স্বীকৃত শিল্পরূপ।


ক্যান্দ্রি ও আরজা: এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক

নি নিয়োমান ক্যান্দ্রির নাম উচ্চারণ করলে আরজা নৃত্যকে অবহেলা করা যায় না। তিনি কেবল একজন শিল্পী নন, বরং একজন ঐতিহ্যের রক্ষক ও প্রেরণার উৎস।

তার ১০৬ বছরের জীবন প্রমাণ করেছে যে—
"শিল্প কখনও বয়সের কাছে হার মানে না।"

পরিশেষে এটুকুই বলা যায়, নি নিয়োমান ক্যান্দ্রি আজ বালির সংস্কৃতির জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর জীবন ও সাধনা প্রমাণ করে—যখন আবেগ, নিষ্ঠা ও শৃঙ্খলা জীবনের সঙ্গী হয়, তখন বয়স কেবল একটি সংখ্যা।

©®তাপসকুমারপাল

Comments

Popular posts from this blog

একক বাদনের সুরে স্মরণে পণ্ডিত ভি. জি. যোগ

বৌদ্ধ মূর্তিতে কোঁকড়ানো চুলের রহস্য

টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার — কবিতা ও সঙ্গীত