ভাদ্র মাসে ভারতের লোকসঙ্গীত : উৎসব, আবহ ও সংস্কৃতি - তাপস কুমার পাল
ভাদ্র মাসে ভারতের লোকসঙ্গীত : উৎসব, আবহ ও সংস্কৃতি
©®প্রতিবেদনে - তাপস কুমার পাল।
"হে মোর চিত্ত,পূণ্য তীর্থে
জাগো রে ধীরে--
এই ভারতের মহামানবের
সাগরতীরে।
হেথায় দাঁড়ায়ে দু-বাহু বাড়ায়ে
নমি নর-দেবতারে,
উদার ছন্দে পরমানন্দে
বন্দন করি তাঁরে।..."
--- গীতাঞ্জলি -কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভারতের গ্রামীণ জীবন ও লোকসংস্কৃতি ঋতুভিত্তিক। প্রতিটি মাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নানা অনুষ্ঠান, দেবদেবীর পূজা, কৃষিকাজ এবং প্রাকৃতিক পরিবর্তন। আর ভাদ্রমাসকে কেন্দ্র করে বাংলা কবিতা, গান, প্রবাদে বহু উল্লেখ পাওয়া যায়— কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভাদ্রমাসের প্রলয়ংকরী ঝড়, বৃষ্টির সৌন্দর্য এবং কৃষকজীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে তাঁর রচনায় এঁকেছেন। আবার, জসীমউদ্দীনের কবিতা ও গান-এ ভাদ্রমাসের মাঠ, কাদা-মাটি, আর কৃষকের সংগ্রাম স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
©®তাপসকুমারপাল
“ভাদ্রে না বরিলে বাঁধবে না ধান”—
এ প্রবাদে কৃষকের সুখ - দু:খ লুকিয়ে আছে। ভাদ্রমাসের বৃষ্টি ধানশস্যের জন্য অপরিহার্য। তাই গ্রামবাংলায় এ সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে কৃষক-জীবন কাটে উদ্বেগে।
আকাশে কখনো ঝমঝমে বৃষ্টি, কখনো হঠাৎ রোদের ঝিলিক—এ দ্বন্দ্বময় রূপ প্রকৃতির কাব্যকে করে তুলেছে বৈচিত্র্যময়। আমরা জানি ভাদ্র মাস (আগস্ট–সেপ্টেম্বর) ভারতবর্ষে বর্ষার মাঝামাঝি ও শস্যরোপণের সময়। এই সময়ে বিভিন্ন প্রদেশে গ্রামীণ মানুষ তাদের আনন্দ, বিশ্বাস ও ভক্তি প্রকাশ করে লোকসঙ্গীতের মাধ্যমে।
🎶 পশ্চিমবঙ্গ : ভাদু গান
ভাদ্রমাসে বাংলার গ্রামীণ সমাজে শুরু হয় ভাদু গান। রাজবংশী ও রাঢ় বাংলার গ্রামে গ্রামে ভাদু দেবীকে ঘিরে এই উৎসব পালিত হয়। মেয়েরা দল বেঁধে উঠোনে, পুকুরপাড়ে বসে গান গায়, খেলায় মেতে ওঠে।
©®তাপসকুমারপাল
পশ্চিমবঙ্গে ভাদ্র মাসের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে ভাদু গান।
• এটি প্রধানত বীরভূম, বাঁকুড়া, বর্ধমান অঞ্চলের গ্রামে প্রচলিত।
• ভাদু দেবীকে কেন্দ্র করে মেয়েরা একত্রিত হয়ে নাচ-গান করে।
• গানগুলোতে থাকে গ্রামের কিশোরীদের খেলা, হাসি-আনন্দ, প্রেম ও সামাজিক জীবনের প্রতিচ্ছবি।
ভাদু গানের উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় -
“এসো এসো ভাদু রানী, দাও আমাদের খেলা,
তোমার সাথে আনন্দে ভরে উঠুক মেলা।”
এছাড়াও, ভাদ্রমাস মানেই কৃষ্ণজন্মাষ্টমী আর বর্তমানে গণেশচতুর্থীর মতো উৎসব। এগুলো গ্রামীণ ও শহুরে জীবনে সমান আনন্দ ছড়িয়ে দেয়।
©®তাপসকুমারপাল
🎶 মহারাষ্ট্র : গণেশ উৎসবের গান
ভাদ্র মাসে মহারাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় উৎসব হলো গণেশ চতুর্থী।
• গ্রামে গ্রামে ঢাক-ঢোল, লাউডস্পিকারে ভক্তিগীতি ও লোকগান গাওয়া হয়।
• গণপতি বাপ্পার বন্দনায় মানুষ একত্রিত হয়।
সবচেয়ে পরিচিত ধ্বনিত হয় এই গান :-
“গণপতি বাপ্পা মোরিয়া, মঙ্গলমূর্তি মোরিয়া।”
©®তাপসকুমারপাল
🎶 ঝাড়খণ্ড ও ছত্তিশগড় : মৌসুমী লোকগান
ভাদ্র মাসে মাঠে চাষাবাদ শুরু হয়। এই সময় কৃষক পরিবারগুলো মৌসুমী টুসু ধরনের গান গায়।
• গানের কথা সাধারণত কৃষিকাজ, বৃষ্টি, ও গ্রামের সামাজিক জীবনকে কেন্দ্র করে।
©®তাপসকুমারপাল
🎶 রাজস্থান : তীজ উৎসবের গান
ভাদ্র মাসে রাজস্থানে পালিত হয় হরিতালিকা তীজ।
• শিব-পার্বতীর পূজা উপলক্ষে নারীরা দোলনায় বসে গান গায়।
• গানে থাকে বর্ষার আনন্দ, দাম্পত্য প্রেম, ও শিব-পার্বতীর কাহিনি।
তাজ উৎসবের গান উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় -
“आज तेरी ओढ़नी गजब भयो रे,
सावन आयो, रंग बरसो रे।”
🎶 অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা : বাথুকাম্মা গান
ভাদ্র মাসে দক্ষিণ ভারতে বাথুকাম্মা উৎসব পালিত হয়।
• নারীরা ফুল দিয়ে সাজানো দেবী বাথুকাম্মাকে ঘিরে গান গায়।
• গানে প্রকৃতি, ভগবতী ও নারীর শক্তির বন্দনা থাকে।
©®তাপসকুমারপাল
🎶 ওড়িশা : কুমার পূর্ণিমার গান
ভাদ্র মাসের শেষ থেকে আশ্বিন মাসে ওড়িশায় কুমার পূর্ণিমা পালিত হয়।
• এখানে গানগুলোর বিষয়— চাঁদ, শ্রীকৃষ্ণ ও তরুণ-তরুণীর প্রেম।
©®তাপসকুমারপাল
✨ ভাদ্র মাসের লোকসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য
১. বর্ষা ও প্রকৃতির আবহ – মেঘ, বৃষ্টি, নদী, ধানক্ষেত।
২. ভক্তি ও দেবতার বন্দনা – গণেশ, শিব, পার্বতী, কৃষ্ণ।
৩. গ্রামীণ জীবন ও কৃষিকাজ – চাষ, গরুর গাড়ি, মাঠের আনন্দ।
৪. নারীর অংশগ্রহণ – প্রায় সব গানেই মেয়েরা মূল পরিবেশক।
৫. আঞ্চলিক বৈচিত্র্য – উত্তর ভারতের কাজরি, বাংলার ভাদু, মহারাষ্ট্রের গণেশ গান, দক্ষিণের বাথুকাম্মা—সব মিলিয়ে রঙিন বৈচিত্র্য।
উপসংহারে বলা যায়, ভারতের লোকসঙ্গীত ঋতুর মতোই বৈচিত্র্যময়। ভাদ্র মাসে যেভাবে বর্ষার আবহ, মাঠের সবুজ ধান, দেব-দেবীর পূজা এবং মেয়েদের মিলনমেলা একসাথে মিশে যায়, তেমনি ভাদ্র মাসের লোকগানও আমাদের সামনে আনে ভারতীয় সংস্কৃতির অপূর্ব চিত্র।
©®তাপসকুমারপাল
©®প্রতিবেদনে - তাপস কুমার পাল।
"হে মোর চিত্ত,পূণ্য তীর্থে
জাগো রে ধীরে--
এই ভারতের মহামানবের
সাগরতীরে।
হেথায় দাঁড়ায়ে দু-বাহু বাড়ায়ে
নমি নর-দেবতারে,
উদার ছন্দে পরমানন্দে
বন্দন করি তাঁরে।..."
--- গীতাঞ্জলি -কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
ভারতের গ্রামীণ জীবন ও লোকসংস্কৃতি ঋতুভিত্তিক। প্রতিটি মাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নানা অনুষ্ঠান, দেবদেবীর পূজা, কৃষিকাজ এবং প্রাকৃতিক পরিবর্তন। আর ভাদ্রমাসকে কেন্দ্র করে বাংলা কবিতা, গান, প্রবাদে বহু উল্লেখ পাওয়া যায়— কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভাদ্রমাসের প্রলয়ংকরী ঝড়, বৃষ্টির সৌন্দর্য এবং কৃষকজীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে তাঁর রচনায় এঁকেছেন। আবার, জসীমউদ্দীনের কবিতা ও গান-এ ভাদ্রমাসের মাঠ, কাদা-মাটি, আর কৃষকের সংগ্রাম স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
©®তাপসকুমারপাল
“ভাদ্রে না বরিলে বাঁধবে না ধান”—
এ প্রবাদে কৃষকের সুখ - দু:খ লুকিয়ে আছে। ভাদ্রমাসের বৃষ্টি ধানশস্যের জন্য অপরিহার্য। তাই গ্রামবাংলায় এ সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে কৃষক-জীবন কাটে উদ্বেগে।
আকাশে কখনো ঝমঝমে বৃষ্টি, কখনো হঠাৎ রোদের ঝিলিক—এ দ্বন্দ্বময় রূপ প্রকৃতির কাব্যকে করে তুলেছে বৈচিত্র্যময়। আমরা জানি ভাদ্র মাস (আগস্ট–সেপ্টেম্বর) ভারতবর্ষে বর্ষার মাঝামাঝি ও শস্যরোপণের সময়। এই সময়ে বিভিন্ন প্রদেশে গ্রামীণ মানুষ তাদের আনন্দ, বিশ্বাস ও ভক্তি প্রকাশ করে লোকসঙ্গীতের মাধ্যমে।
🎶 পশ্চিমবঙ্গ : ভাদু গান
ভাদ্রমাসে বাংলার গ্রামীণ সমাজে শুরু হয় ভাদু গান। রাজবংশী ও রাঢ় বাংলার গ্রামে গ্রামে ভাদু দেবীকে ঘিরে এই উৎসব পালিত হয়। মেয়েরা দল বেঁধে উঠোনে, পুকুরপাড়ে বসে গান গায়, খেলায় মেতে ওঠে।
©®তাপসকুমারপাল
পশ্চিমবঙ্গে ভাদ্র মাসের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি জড়িয়ে আছে ভাদু গান।
• এটি প্রধানত বীরভূম, বাঁকুড়া, বর্ধমান অঞ্চলের গ্রামে প্রচলিত।
• ভাদু দেবীকে কেন্দ্র করে মেয়েরা একত্রিত হয়ে নাচ-গান করে।
• গানগুলোতে থাকে গ্রামের কিশোরীদের খেলা, হাসি-আনন্দ, প্রেম ও সামাজিক জীবনের প্রতিচ্ছবি।
ভাদু গানের উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় -
“এসো এসো ভাদু রানী, দাও আমাদের খেলা,
তোমার সাথে আনন্দে ভরে উঠুক মেলা।”
এছাড়াও, ভাদ্রমাস মানেই কৃষ্ণজন্মাষ্টমী আর বর্তমানে গণেশচতুর্থীর মতো উৎসব। এগুলো গ্রামীণ ও শহুরে জীবনে সমান আনন্দ ছড়িয়ে দেয়।
©®তাপসকুমারপাল
🎶 বিহার ও উত্তরপ্রদেশ : কাজরি গান
ভাদ্র মাস মানেই বর্ষার ঘনঘটা। এই সময় বিহার ও উত্তরপ্রদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকসংগীত হলো কাজরি গান।
• মেয়েরা দল বেঁধে আঙিনা বা মাঠে বসে গান গায়।
• মূল বিষয়— মেঘ, বৃষ্টি, কৃষ্ণচন্দ্র, প্রিয়জনের অপেক্ষা ও বিরহ।
কাজরি গানের উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় -
“बरसे बदरिया सावन की,
पिया घर आवे ना…”
এই গানে বৃষ্টির আবহে প্রিয়জনের অনুপস্থিতির ব্যথা ফুটে ওঠে।
🎶 বিহার ও উত্তরপ্রদেশ : কাজরি গান
ভাদ্র মাস মানেই বর্ষার ঘনঘটা। এই সময় বিহার ও উত্তরপ্রদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকসংগীত হলো কাজরি গান।
• মেয়েরা দল বেঁধে আঙিনা বা মাঠে বসে গান গায়।
• মূল বিষয়— মেঘ, বৃষ্টি, কৃষ্ণচন্দ্র, প্রিয়জনের অপেক্ষা ও বিরহ।
কাজরি গানের উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় -
“बरसे बदरिया सावन की,
पिया घर आवे ना…”
এই গানে বৃষ্টির আবহে প্রিয়জনের অনুপস্থিতির ব্যথা ফুটে ওঠে।
©®তাপসকুমারপাল
🎶 মহারাষ্ট্র : গণেশ উৎসবের গান
ভাদ্র মাসে মহারাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় উৎসব হলো গণেশ চতুর্থী।
• গ্রামে গ্রামে ঢাক-ঢোল, লাউডস্পিকারে ভক্তিগীতি ও লোকগান গাওয়া হয়।
• গণপতি বাপ্পার বন্দনায় মানুষ একত্রিত হয়।
সবচেয়ে পরিচিত ধ্বনিত হয় এই গান :-
“গণপতি বাপ্পা মোরিয়া, মঙ্গলমূর্তি মোরিয়া।”
©®তাপসকুমারপাল
🎶 ঝাড়খণ্ড ও ছত্তিশগড় : মৌসুমী লোকগান
ভাদ্র মাসে মাঠে চাষাবাদ শুরু হয়। এই সময় কৃষক পরিবারগুলো মৌসুমী টুসু ধরনের গান গায়।
• গানের কথা সাধারণত কৃষিকাজ, বৃষ্টি, ও গ্রামের সামাজিক জীবনকে কেন্দ্র করে।
©®তাপসকুমারপাল
🎶 রাজস্থান : তীজ উৎসবের গান
ভাদ্র মাসে রাজস্থানে পালিত হয় হরিতালিকা তীজ।
• শিব-পার্বতীর পূজা উপলক্ষে নারীরা দোলনায় বসে গান গায়।
• গানে থাকে বর্ষার আনন্দ, দাম্পত্য প্রেম, ও শিব-পার্বতীর কাহিনি।
তাজ উৎসবের গান উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় -
“आज तेरी ओढ़नी गजब भयो रे,
सावन आयो, रंग बरसो रे।”
🎶 অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা : বাথুকাম্মা গান
ভাদ্র মাসে দক্ষিণ ভারতে বাথুকাম্মা উৎসব পালিত হয়।
• নারীরা ফুল দিয়ে সাজানো দেবী বাথুকাম্মাকে ঘিরে গান গায়।
• গানে প্রকৃতি, ভগবতী ও নারীর শক্তির বন্দনা থাকে।
©®তাপসকুমারপাল
🎶 ওড়িশা : কুমার পূর্ণিমার গান
ভাদ্র মাসের শেষ থেকে আশ্বিন মাসে ওড়িশায় কুমার পূর্ণিমা পালিত হয়।
• এখানে গানগুলোর বিষয়— চাঁদ, শ্রীকৃষ্ণ ও তরুণ-তরুণীর প্রেম।
©®তাপসকুমারপাল
✨ ভাদ্র মাসের লোকসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য
১. বর্ষা ও প্রকৃতির আবহ – মেঘ, বৃষ্টি, নদী, ধানক্ষেত।
২. ভক্তি ও দেবতার বন্দনা – গণেশ, শিব, পার্বতী, কৃষ্ণ।
৩. গ্রামীণ জীবন ও কৃষিকাজ – চাষ, গরুর গাড়ি, মাঠের আনন্দ।
৪. নারীর অংশগ্রহণ – প্রায় সব গানেই মেয়েরা মূল পরিবেশক।
৫. আঞ্চলিক বৈচিত্র্য – উত্তর ভারতের কাজরি, বাংলার ভাদু, মহারাষ্ট্রের গণেশ গান, দক্ষিণের বাথুকাম্মা—সব মিলিয়ে রঙিন বৈচিত্র্য।
উপসংহারে বলা যায়, ভারতের লোকসঙ্গীত ঋতুর মতোই বৈচিত্র্যময়। ভাদ্র মাসে যেভাবে বর্ষার আবহ, মাঠের সবুজ ধান, দেব-দেবীর পূজা এবং মেয়েদের মিলনমেলা একসাথে মিশে যায়, তেমনি ভাদ্র মাসের লোকগানও আমাদের সামনে আনে ভারতীয় সংস্কৃতির অপূর্ব চিত্র।
©®তাপসকুমারপাল
Comments