গণেশের শুঁড় : প্রতীক, শাস্ত্র ও পূজা প্রচলন
গণেশের শুঁড় : প্রতীক, শাস্ত্র ও পূজা প্রচলন
প্রতিবেদন - তাপস কুমার পাল
হিন্দু ধর্মে ভগবান গণেশ হলেন বিঘ্নহর্তা, সিদ্ধিদাতা এবং বুদ্ধিদাতা। যে কোনো শুভ কাজ শুরুর আগে “শ্রীগণেশ” উচ্চারণ করার প্রচলন হাজার বছরের। কিন্তু গণেশের মূর্তি বা প্রতিমার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো— তাঁর "শুঁড়ের দিক"। শুঁড় ডানদিকে বাঁকানো নাকি বাঁদিকে বাঁকানো, এই প্রশ্নের মধ্যেই নিহিত আছে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা।
শাস্ত্রে শুঁড়ের তাৎপর্য
প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র ও তন্ত্রে বলা হয়েছে, মানবশরীরে তিনটি প্রধান নাড়ীর উল্লেখ পাওয়া যায়—
• ইড়া নাড়ী (বাঁ দিক) : চন্দ্র বা শীতলতার প্রতীক।
• পিংগলা নাড়ী (ডান দিক) : সূর্য বা তেজের প্রতীক।
• সুষুম্না নাড়ী (মধ্য ভাগ) : আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক।
গণেশের শুঁড় কখন বাঁদিকে, কখন ডানদিকে বাঁকানো— তা আসলে এই নাড়ীগুলির প্রতীকী রূপক।
ডান দিকে শুঁড়যুক্ত গণেশ
• পরিচয় : ডান দিকে শুঁড়যুক্ত গণেশকে বলা হয় সিদ্ধি বিনায়ক বা পিংগলা বিনায়ক।
• শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা :
• “শ্রী গণেশতন্ত্র” ও “মুদ্গল পুরাণ”-এ উল্লেখ আছে যে, ডানদিকে শুঁড়যুক্ত গণেশ সূর্যের তেজ ও শক্তির প্রতীক।
• তিনি উগ্রশক্তিধর রূপ, যাঁর পূজা করতে হলে কঠোর ব্রত, উপবাস এবং নির্দিষ্ট মন্ত্রোচ্চারণ মানতেই হয়।
• কারা পূজা করেন :
• সাধক, যোগী, তান্ত্রিক এবং যারা সিদ্ধিলাভ বা আধ্যাত্মিক শক্তি কামনা করেন, তাঁরা এই রূপের পূজা করেন।
• সাধারণ গৃহস্থরা সচরাচর পূজা করেন না, কারণ এই পূজা ঠিকভাবে না করলে অশুভ ফলও ঘটতে পারে বলে বিশ্বাস।
• প্রতীকী দিক :
• সূর্যের তেজ, অগ্নিশক্তি, বীর্য এবং সাহসের প্রতীক।
• রাজারাজড়ার রাজসভায় বা শক্তিসাধকদের মণ্ডপে এঁর পূজা প্রচলিত ছিল।
বাঁ দিকে শুঁড়যুক্ত গণেশ
• পরিচয় : বাঁ দিকে শুঁড়যুক্ত গণেশকে বলা হয় শান্ত বিনায়ক বা ইড়া বিনায়ক।
• শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা :
• “গণপতি উপনিষদ”-এ বলা হয়েছে, বাঁ দিকে শুঁড় চন্দ্র নাড়ীর প্রতীক।
• এই রূপ শান্ত, মঙ্গলময়, শুভ এবং সহজে পূজাযোগ্য।
• কারা পূজা করেন :
• সাধারণ গৃহস্থ, ব্যবসায়ী, ছাত্রছাত্রী, এবং সংসারীরা।
• গৃহস্থালী পূজা, বিবাহ, অন্নপ্রাশন, গৃহপ্রবেশ, দোকান বা ব্যবসা শুরুর মতো শুভ কাজের আগে এই রূপই পূজিত হন।
• প্রতীকী দিক :
• চন্দ্রের শীতলতা, শান্তি, সম্পদ, সুখ ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
• তাই প্রতিদিনের পূজা ও লোকাচারে বাঁদিকে শুঁড়যুক্ত গণেশই সর্বাধিক দেখা যায়।
শুঁড়ের দিকভেদ অনুযায়ী প্রভাব
চিত্র :- নৃত্যরত গণেশ, খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দী।
পুরাণে আছে, একবার দেবী পার্বতী গণেশকে বললেন, “তুমি সর্বদা মাতৃস্নেহে আবদ্ধ থাকবে।” সেই কারণে অধিকাংশ গণেশমূর্তিতে শুঁড় বাঁ দিকে থাকে— কারণ বাঁদিককে “মায়ের দিক” ধরা হয়। আবার ভগবান শিব গণেশকে আশীর্বাদ দিয়েছিলেন— “তুমি সাধকদেরও সিদ্ধি দেবে”— তাই কিছু মূর্তিতে শুঁড় ডান দিকেও রাখা হয়।
• মিষ্টির পাত্রের দিক
লোককথা অনুযায়ী, গণেশ অত্যন্ত মিষ্টিপ্রেমী। বলা হয়, তাঁর শুঁড় যেদিকে বাঁকানো, সেই দিকেই মোদক বা লাড্ডুর পাত্র রাখা থাকে। বাঁ দিকে শুঁড় মানে মায়ের হাতে বানানো মিষ্টির দিকে ঝোঁক, আর ডান দিকে শুঁড় মানে সাধকের অর্পিত নৈবেদ্যের দিকে ঝোঁক।
• সূর্য ও চন্দ্রের প্রতীক
গ্রামীণ বিশ্বাসে বলা হয়, ডান দিকের শুঁড় সূর্যের প্রতীক— শক্তিশালী, উগ্র, দিবালোকের মতো তেজস্বী। বাঁ দিকের শুঁড় হলো চন্দ্রের প্রতীক— শান্ত, স্নিগ্ধ ও মাতৃস্নেহময়। তাই গৃহস্থরা চাঁদের মতো শান্ত রূপের গণেশকেই বেশি পূজা করেন।
• বণিকদের প্রচলিত কথা
বাংলার বণিক সমাজে একটা প্রবাদ আছে—
“ডান শুঁড় সিদ্ধির, বাঁ শুঁড় বণিকের।”
অর্থাৎ ডান শুঁড় সাধকের সিদ্ধির জন্য, আর বাঁ শুঁড় গৃহস্থ ব্যবসায়ীর সমৃদ্ধির জন্য।
• শিশু গণেশের কাহিনি
দক্ষিণ ভারতে একটি জনপ্রিয় কাহিনি আছে— ছোটবেলায় গণেশ একদিন খেলার ছলে বাঁ দিকে শুঁড় ঘুরিয়ে মায়ের আঁচল টানছিলেন। তখন থেকেই বিশ্বাস জন্মায় যে বাঁদিকের শুঁড় মাতৃস্নেহ ও গৃহস্থ জীবনের আনন্দের প্রতীক।
এই হলো গণেশের শুঁড়। তাই গণেশের শুঁড় নিয়ে শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা যেমন আছে, তেমনই প্রচলিত আছে বহু লোককথা ও বিশ্বাস। এসব কাহিনি প্রমাণ করে যে ভগবান গণেশ শুধুই পুরাণের দেবতা নন, তিনি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছেন।আর গণেশের শুঁড় আসলে আধ্যাত্মিক নাড়ীশক্তির প্রতীক। "ডান দিকে শুঁড়" তেজ, কঠোরতা ও সিদ্ধির প্রতীক, যা সাধক ও শক্তিপূজকদের জন্য উপযোগী। আর "বাঁ দিকে শুঁড়" শান্তি, মঙ্গল ও গৃহস্থ জীবনের সৌভাগ্যের প্রতীক, যা সাধারণ ভক্তদের জীবনে মিশে আছে। তাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গৃহস্থের পূজা ও সমাজ জীবনে বাঁ দিকে শুঁড়যুক্ত গণেশই সর্বাধিক পূজিত ও জনপ্রিয়।
চিত্রগুলি গৌড়ীয় নৃত্যের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ড. মহুয়া মুখোপাধ্যায় থেকে প্রাপ্ত।
প্রতিবেদন - তাপস কুমার পাল
হিন্দু ধর্মে ভগবান গণেশ হলেন বিঘ্নহর্তা, সিদ্ধিদাতা এবং বুদ্ধিদাতা। যে কোনো শুভ কাজ শুরুর আগে “শ্রীগণেশ” উচ্চারণ করার প্রচলন হাজার বছরের। কিন্তু গণেশের মূর্তি বা প্রতিমার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো— তাঁর "শুঁড়ের দিক"। শুঁড় ডানদিকে বাঁকানো নাকি বাঁদিকে বাঁকানো, এই প্রশ্নের মধ্যেই নিহিত আছে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা।
শাস্ত্রে শুঁড়ের তাৎপর্য
প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র ও তন্ত্রে বলা হয়েছে, মানবশরীরে তিনটি প্রধান নাড়ীর উল্লেখ পাওয়া যায়—
• ইড়া নাড়ী (বাঁ দিক) : চন্দ্র বা শীতলতার প্রতীক।
• পিংগলা নাড়ী (ডান দিক) : সূর্য বা তেজের প্রতীক।
• সুষুম্না নাড়ী (মধ্য ভাগ) : আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক।
গণেশের শুঁড় কখন বাঁদিকে, কখন ডানদিকে বাঁকানো— তা আসলে এই নাড়ীগুলির প্রতীকী রূপক।
ডান দিকে শুঁড়যুক্ত গণেশ
• পরিচয় : ডান দিকে শুঁড়যুক্ত গণেশকে বলা হয় সিদ্ধি বিনায়ক বা পিংগলা বিনায়ক।
• শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা :
• “শ্রী গণেশতন্ত্র” ও “মুদ্গল পুরাণ”-এ উল্লেখ আছে যে, ডানদিকে শুঁড়যুক্ত গণেশ সূর্যের তেজ ও শক্তির প্রতীক।
• তিনি উগ্রশক্তিধর রূপ, যাঁর পূজা করতে হলে কঠোর ব্রত, উপবাস এবং নির্দিষ্ট মন্ত্রোচ্চারণ মানতেই হয়।
• কারা পূজা করেন :
• সাধক, যোগী, তান্ত্রিক এবং যারা সিদ্ধিলাভ বা আধ্যাত্মিক শক্তি কামনা করেন, তাঁরা এই রূপের পূজা করেন।
• সাধারণ গৃহস্থরা সচরাচর পূজা করেন না, কারণ এই পূজা ঠিকভাবে না করলে অশুভ ফলও ঘটতে পারে বলে বিশ্বাস।
• প্রতীকী দিক :
• সূর্যের তেজ, অগ্নিশক্তি, বীর্য এবং সাহসের প্রতীক।
• রাজারাজড়ার রাজসভায় বা শক্তিসাধকদের মণ্ডপে এঁর পূজা প্রচলিত ছিল।
বাঁ দিকে শুঁড়যুক্ত গণেশ
• পরিচয় : বাঁ দিকে শুঁড়যুক্ত গণেশকে বলা হয় শান্ত বিনায়ক বা ইড়া বিনায়ক।
• শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা :
• “গণপতি উপনিষদ”-এ বলা হয়েছে, বাঁ দিকে শুঁড় চন্দ্র নাড়ীর প্রতীক।
• এই রূপ শান্ত, মঙ্গলময়, শুভ এবং সহজে পূজাযোগ্য।
• কারা পূজা করেন :
• সাধারণ গৃহস্থ, ব্যবসায়ী, ছাত্রছাত্রী, এবং সংসারীরা।
• গৃহস্থালী পূজা, বিবাহ, অন্নপ্রাশন, গৃহপ্রবেশ, দোকান বা ব্যবসা শুরুর মতো শুভ কাজের আগে এই রূপই পূজিত হন।
• প্রতীকী দিক :
• চন্দ্রের শীতলতা, শান্তি, সম্পদ, সুখ ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
• তাই প্রতিদিনের পূজা ও লোকাচারে বাঁদিকে শুঁড়যুক্ত গণেশই সর্বাধিক দেখা যায়।
শুঁড়ের দিকভেদ অনুযায়ী প্রভাব
চিত্র :- নৃত্যরত গণেশ, খ্রিস্টীয় দশম শতাব্দী।
কালো ব্যাসল্ট, পাল যুগ। এলাকা- ময়দা।
ডান দিকের শুঁড় :
• পূজা করলে দ্রুত সিদ্ধিলাভ হয়।
• তেজ, শক্তি ও শত্রুনাশ সাধিত হয়।
• তবে পূজায় সামান্য ত্রুটি হলে বিপরীত ফল হতে পারে।
চিত্র:- পশ্চিমবঙ্গের দিনাজপুরের গণেশ। এখন মুর্তি টি লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি মিউজিয়াম অফ আর্টে সংরক্ষিত। পাল যুগের শেষের দকেস্থা স্থাপত্য। আনুমানিক ১১ শতক।
বাঁ দিকের শুঁড় :
• শান্তি, সৌভাগ্য ও স্থায়ী সমৃদ্ধি লাভ হয়।
• সহজ আচার-অনুষ্ঠানে পূজা সম্ভব।
• গৃহস্থদের জন্য বিশেষ উপযোগী।
পুরাণ ও লোকবিশ্বাস
• মুদ্গল পুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-এ গণেশের বিভিন্ন রূপের বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, গণেশ মূলত গৃহস্থের অভিভাবক দেবতা। তাই তাঁর শান্তরূপ, অর্থাৎ বাঁদিকে শুঁড়যুক্ত মূর্তি সর্বত্র প্রচলিত।
• লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, বাঁ দিকে শুঁড়যুক্ত গণেশ মায়ের কোলে শিশুর মতো, আর ডান দিকে শুঁড়যুক্ত গণেশ যেন পিতার রূপ— কঠোর ও শাসক।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রচলন
• মহারাষ্ট্রে গণেশ চতুর্থী উৎসবে অধিকাংশ প্রতিমায় বাঁ দিকের শুঁড় দেখা যায়।
• দক্ষিণ ভারতে কিছু মন্দিরে বিশেষ তান্ত্রিক আচার অনুসারে ডানদিকে শুঁড়যুক্ত গণেশের পূজা হয়।
• বাংলায় গৃহস্থালী পূজা ও দুর্গাপূজার মণ্ডপে বাঁ দিকের শুঁড়যুক্ত গণেশ প্রতিমাই প্রচলিত।
চিত্র - পাল যুগের শৈলীর চিত্রকলা
গণেশের শুঁড় নিয়ে লোককথা ও কিংবদন্তি
• শিব-পার্বতীর আদেশের কাহিনি
কলকাতা আশুতোষ জাদুঘরে সংরক্ষিত।
ডান দিকের শুঁড় :
• পূজা করলে দ্রুত সিদ্ধিলাভ হয়।
• তেজ, শক্তি ও শত্রুনাশ সাধিত হয়।
• তবে পূজায় সামান্য ত্রুটি হলে বিপরীত ফল হতে পারে।
চিত্র:- পশ্চিমবঙ্গের দিনাজপুরের গণেশ। এখন মুর্তি টি লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি মিউজিয়াম অফ আর্টে সংরক্ষিত। পাল যুগের শেষের দকেস্থা স্থাপত্য। আনুমানিক ১১ শতক।
বাঁ দিকের শুঁড় :
• শান্তি, সৌভাগ্য ও স্থায়ী সমৃদ্ধি লাভ হয়।
• সহজ আচার-অনুষ্ঠানে পূজা সম্ভব।
• গৃহস্থদের জন্য বিশেষ উপযোগী।
পুরাণ ও লোকবিশ্বাস
• মুদ্গল পুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-এ গণেশের বিভিন্ন রূপের বর্ণনা পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, গণেশ মূলত গৃহস্থের অভিভাবক দেবতা। তাই তাঁর শান্তরূপ, অর্থাৎ বাঁদিকে শুঁড়যুক্ত মূর্তি সর্বত্র প্রচলিত।
• লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, বাঁ দিকে শুঁড়যুক্ত গণেশ মায়ের কোলে শিশুর মতো, আর ডান দিকে শুঁড়যুক্ত গণেশ যেন পিতার রূপ— কঠোর ও শাসক।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রচলন
• মহারাষ্ট্রে গণেশ চতুর্থী উৎসবে অধিকাংশ প্রতিমায় বাঁ দিকের শুঁড় দেখা যায়।
• দক্ষিণ ভারতে কিছু মন্দিরে বিশেষ তান্ত্রিক আচার অনুসারে ডানদিকে শুঁড়যুক্ত গণেশের পূজা হয়।
• বাংলায় গৃহস্থালী পূজা ও দুর্গাপূজার মণ্ডপে বাঁ দিকের শুঁড়যুক্ত গণেশ প্রতিমাই প্রচলিত।
চিত্র - পাল যুগের শৈলীর চিত্রকলা
গণেশের শুঁড় নিয়ে লোককথা ও কিংবদন্তি
• শিব-পার্বতীর আদেশের কাহিনি
পুরাণে আছে, একবার দেবী পার্বতী গণেশকে বললেন, “তুমি সর্বদা মাতৃস্নেহে আবদ্ধ থাকবে।” সেই কারণে অধিকাংশ গণেশমূর্তিতে শুঁড় বাঁ দিকে থাকে— কারণ বাঁদিককে “মায়ের দিক” ধরা হয়। আবার ভগবান শিব গণেশকে আশীর্বাদ দিয়েছিলেন— “তুমি সাধকদেরও সিদ্ধি দেবে”— তাই কিছু মূর্তিতে শুঁড় ডান দিকেও রাখা হয়।
• মিষ্টির পাত্রের দিক
লোককথা অনুযায়ী, গণেশ অত্যন্ত মিষ্টিপ্রেমী। বলা হয়, তাঁর শুঁড় যেদিকে বাঁকানো, সেই দিকেই মোদক বা লাড্ডুর পাত্র রাখা থাকে। বাঁ দিকে শুঁড় মানে মায়ের হাতে বানানো মিষ্টির দিকে ঝোঁক, আর ডান দিকে শুঁড় মানে সাধকের অর্পিত নৈবেদ্যের দিকে ঝোঁক।
• সূর্য ও চন্দ্রের প্রতীক
গ্রামীণ বিশ্বাসে বলা হয়, ডান দিকের শুঁড় সূর্যের প্রতীক— শক্তিশালী, উগ্র, দিবালোকের মতো তেজস্বী। বাঁ দিকের শুঁড় হলো চন্দ্রের প্রতীক— শান্ত, স্নিগ্ধ ও মাতৃস্নেহময়। তাই গৃহস্থরা চাঁদের মতো শান্ত রূপের গণেশকেই বেশি পূজা করেন।
• বণিকদের প্রচলিত কথা
বাংলার বণিক সমাজে একটা প্রবাদ আছে—
“ডান শুঁড় সিদ্ধির, বাঁ শুঁড় বণিকের।”
অর্থাৎ ডান শুঁড় সাধকের সিদ্ধির জন্য, আর বাঁ শুঁড় গৃহস্থ ব্যবসায়ীর সমৃদ্ধির জন্য।
• শিশু গণেশের কাহিনি
দক্ষিণ ভারতে একটি জনপ্রিয় কাহিনি আছে— ছোটবেলায় গণেশ একদিন খেলার ছলে বাঁ দিকে শুঁড় ঘুরিয়ে মায়ের আঁচল টানছিলেন। তখন থেকেই বিশ্বাস জন্মায় যে বাঁদিকের শুঁড় মাতৃস্নেহ ও গৃহস্থ জীবনের আনন্দের প্রতীক।
এই হলো গণেশের শুঁড়। তাই গণেশের শুঁড় নিয়ে শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা যেমন আছে, তেমনই প্রচলিত আছে বহু লোককথা ও বিশ্বাস। এসব কাহিনি প্রমাণ করে যে ভগবান গণেশ শুধুই পুরাণের দেবতা নন, তিনি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছেন।আর গণেশের শুঁড় আসলে আধ্যাত্মিক নাড়ীশক্তির প্রতীক। "ডান দিকে শুঁড়" তেজ, কঠোরতা ও সিদ্ধির প্রতীক, যা সাধক ও শক্তিপূজকদের জন্য উপযোগী। আর "বাঁ দিকে শুঁড়" শান্তি, মঙ্গল ও গৃহস্থ জীবনের সৌভাগ্যের প্রতীক, যা সাধারণ ভক্তদের জীবনে মিশে আছে। তাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গৃহস্থের পূজা ও সমাজ জীবনে বাঁ দিকে শুঁড়যুক্ত গণেশই সর্বাধিক পূজিত ও জনপ্রিয়।
চিত্রগুলি গৌড়ীয় নৃত্যের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ড. মহুয়া মুখোপাধ্যায় থেকে প্রাপ্ত।
©®তাপসকুমারপাল
Comments