নাগলিঙ্গম : এক পবিত্র বৃক্ষের আধ্যাত্মিক আবাহন - তাপস কুমার পাল

নাগলিঙ্গম : এক পবিত্র বৃক্ষের আধ্যাত্মিক আবাহন

©® প্রতিবেদনে - তাপস কুমার পাল।

ভারতবর্ষের ইতিহাস এক বিচিত্র মেলবন্ধনের কাহিনি। প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক কালে বিদেশিদের আগমন শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক দিকেই নয়, বরং সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলেছে। আর্য, গ্রিক, শক, হুণ, আরব, তুর্কি, মুঘল কিংবা ইউরোপীয় বণিক— প্রত্যেকের সঙ্গেই ভারত পেয়েছে নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা, ভাষা, শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও শাসন ব্যবস্থা। এই বিদেশি প্রভাব শুধু মানুষের জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং প্রকৃতির সঙ্গেও তার যোগসূত্র রচিত হয়েছে। যেমন নাগলিঙ্গম নামের এক বিদেশি বৃক্ষ, যার ফল ও ফুল দেখে ধর্মীয় তাৎপর্য যুক্ত হয়েছে এবং ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গেছে। এইভাবেই বিদেশিদের আগমন ভারতকে সমৃদ্ধ করেছে বহুবর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে।

©®তাপসকুমারপাল

আমরা জানি, মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকা থেকে পর্তুগিজরা এনেছিল (১৭শ শতক) "গাঁদা ফুল" (Marigold)। পরবর্তীতে এই ফুলকেই হিন্দু ধর্মে শুভ মনে করা হয়। দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপুজো থেকে সমস্ত পুজো তে এই ফুলের ব্যপক ব্যবহার হয়। তারপর "গোলাপ" ফুল (Rose) ছাড়া বিয়ে বা রঙ্গিন উৎসবে ভাবাই যায় না অথচ এই ফুল এসেছে ইরান ও মধ্য এশিয়া থেকে। ১৬শ শতকে মুঘল আমলে ভারতে আসে । শুধু হিন্দু রা নয় এই গোলাপ সুফি ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মে পবিত্রতা ও ভক্তির প্রতীক। এমনকি দরগাহে গোলাপের পাপড়ি অর্পণ করা হয়। আবার "রজনীগন্ধা" ফুল (Tuberose) এসেছে মেক্সিকো থেকে পর্তুগিজদের মাধ্যমে ভারতে আসে (১৭শ শতক)। আবার হিন্দু ধর্মে বিবাহ ও পূজার্চনায় শুভতার প্রতীক। দুর্গাপূজা ও বৈষ্ণব আচারেও ব্যাপক ব্যবহার হয়। 'এক গোছা রজনী গন্ধা হাতে দিয়ে বললাম চললাম'-  অর্থাৎ বিয়োগান্ত বিষয়েও এই ফুলের কদর আছে। এরপরে আফ্রিকা হয়ে ইউরোপীয় বণিকদের মাধ্যমে ভারতে আসে (ঔপনিবেশিক যুগে)। "গ্লাডিওলাস" ফুল। (Gladiolus)।  এই ফুলের বাংলা কি বলে ডাকা হয় জানি না। খোঁজ ও পাই নি।  এই ফুল যা খ্রিস্টান ধর্মে ‘শহীদদের সাহস ও শক্তি’র প্রতীক বলে মান্যতা দেওয়া হয়। বর্তমানে ভারতীয় চার্চে সাজসজ্জায় ব্যবহৃত হয়। এবার যে ফুলের উপর আলো ফেলবো সেই ফুলের গাছ সূদুর দক্ষিণ আমেরিকা থেকে এসেছে এই কলকাতায় তারপর ভারতের অন্যান্য জায়গায় গিয়েছে এই শহর থেকে।।



কলকাতা গড়ে ওঠার আগে বাংলায় পর্তুগিজদের আগমন ঘটে

কলকাতা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৬৯০ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজদের হাত ধরে। তবে তার আগেই ইউরোপীয় শক্তি হিসেবে বাংলায় প্রবেশ করেছিল পর্তুগিজরা। ১৫১৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম পর্তুগিজরা বাংলায় আসে। ১৫৭৯ সালে সম্রাট আকবরের অনুমতিতে তারা হুগলি নদীর তীরে স্থায়ী বসতি ও বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে তোলে। রেশম, নীল, চাল, লবণ, মসলা প্রভৃতি বাণিজ্যে তারা যুক্ত হয়। শুরুতে বাণিজ্যে সক্রিয় থাকলেও পরে তারা জলদস্যুতা ও দাসব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় মানুষকে ধরে নিয়ে দাস হিসেবে বিক্রি করত। পাশাপাশি খ্রিষ্টধর্ম প্রচারেও মনোযোগী ছিল। এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর মোগল সম্রাটের কানে পৌঁছালে ১৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট শাহজাহানের সেনাপতি কুতুবউদ্দিন খান হুগলি দুর্গ আক্রমণ করে প্রায় ৪,০০০ পর্তুগিজকে বন্দি করে। এবং পর্তুগিজ শক্তি ভেঙে দেন। এর পর থেকে বাংলায় তাদের প্রভাব প্রায় শেষ হয়ে যায়। এই হলো সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। হুগলির এই পরাজয়ের পর পর্তুগিজদের ক্ষমতা ক্রমে ক্ষয় হয়। ডাচ, ফরাসি এবং ইংরেজ ব্যবসায়ীরা বাংলায় প্রবেশ করে। ১৬৯০ সালে ইংরেজদের জব চার্ণক সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কালিকাতা গ্রাম একত্র করে কলকাতা গড়ে তোলেন।

©®তাপসকুমারপাল

কিন্তু সেই সময় ব্যবসায়ী পর্তুগিজদের হাত ধরে
দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কলকাতায় আসে কুরুপিটা গুইয়ানেনসিস (Couroupita guianensis), নামক গাছ যা এখানে এসে নাম হয়- "শিবলিঙ্গম" বা "নাগলিঙ্গম" গাছ। ভারতের সংস্কৃতিতে গাছপালা শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের উপকরণ নয়, বরং ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও লোকবিশ্বাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত।


নাগলিঙ্গম গাছের ধর্মীয় তাৎপর্য


প্রকৃতির বহু উপাদান ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রতীক ও আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তেমনই একটি রহস্যময় ও পূজনীয় বৃক্ষ হলো  নাগলিঙ্গম গাছ (Couroupita guianensis)। এর ফুলের গঠন, গন্ধ এবং উপস্থিতি ভারতীয় ধর্মবিশ্বাস, বিশেষত শৈব ধর্মমতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যদিও এটি দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আগত, তবুও ভারতে এসে নাগলিঙম গাছ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।




নাগলিঙ্গম গাছে ধর্মীয় রূপ

নাগলিঙ্গম গাছের নামেই তার ধর্মীয় তাৎপর্যের ইঙ্গিত রয়েছে —
‘নাগ’ অর্থে সাপ বা ফণাধর,
আর ‘লিঙ্গ’ অর্থে শিবলিঙ্গ।
এই গাছের ফুল দেখতে অনেকটা ফণাধর সাপ দিয়ে ঘেরা শিবলিঙ্গের মতো। এমন অলৌকিক গঠনের জন্যই এই ফুল শিবের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

©®তাপসকুমারপাল

হিন্দু ধর্মে নাগলিঙ্গম ফুলের গুরুত্ব:

১. শিবপূজায় ব্যবহৃত ফুল:

নাগলিঙম ফুলকে অনেক অঞ্চলে শিবপূজার অন্যতম পবিত্র উপাচার হিসেবে ধরা হয়।
বিশেষত মহাশিবরাত্রি, সোমবার ব্রত, বা শ্রাবণ মাসের শিবপূজায় এই ফুল নিবেদন করা হয়।

২. শিবলিঙ্গের আকৃতি:

ফুলের কেন্দ্রে রয়েছে এক সাদা, মসৃণ উত্থিত অংশ যা অনেকটা শিবলিঙ্গের মতো। এর চারপাশে থাকে ফণাধর নাগের মতো ঘূর্ণায়মান পরাগচক্র। এই গঠন হিন্দু ধর্মমতে শিব ও নাগের যুগল প্রতীক।

৩. নাগ-পূজার সঙ্গে সম্পর্ক:

নাগদেবতার পূজাও হিন্দু ধর্মে গুরুত্বপূর্ণ। নাগলিঙম ফুলে সাপের ফণার মতো গঠন থাকায়, এটিকে নাগদেবতা ও শিব উভয়ের অনুকল্প হিসেবে ধরা হয়। এতে দেবতা দ্বয়ের আশীর্বাদ লাভের বিশ্বাস রয়েছে।


পুরাণে উল্লেখ নেই কিন্তু লোকবিশ্বাসে আছে

যদিও প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে Couroupita guianensis নামের সরাসরি উল্লেখ নেই (কারণ এটি একটি বিদেশি গাছ), তবে লোককথা ও মন্দির-প্রচলন এই গাছকে শিবের সঙ্গে একত্রিত করেছে।

জনশ্রুতি অনুযায়ী:

– দক্ষিণ ভারতের এক শিবভক্ত সাধক স্বপ্নে এই গাছের দর্শন পান
– পরবর্তীতে তামিলনাড়ু, কর্ণাটক ও কেরলে মন্দিরের চত্বরে এটি রোপণ শুরু হয়
– স্থানীয় পুরোহিতরা এটিকে ‘শিবকাঁঠা বৃক্ষ’ বলে ডাকতে শুরু করেন


©®তাপসকুমারপাল

বর্তমানে বিভিন্ন  মন্দিরে নাগলিঙ্গম গাছের উপস্থিতি:

ভারতের বহু শিবমন্দিরে এই গাছ এখন নিয়মিত রোপণ ও পূজিত হচ্ছে। যেমন:

• দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দির (কলকাতা)

• মহাবলেশ্বর মন্দির (মহারাষ্ট্র)

• চিদাম্বরম নটরাজ মন্দির (তামিলনাড়ু)

• বেলুড় মঠ (পূর্ব মণ্ডপের পাশে)

এই সব মন্দিরে ভক্তরা নাগলিঙম ফুল নিবেদন করেন শিবলিঙ্গে, এবং গাছকেও পূর্ণার্ঘ্য নিবেদন করে থাকেন।




আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা:

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ছাড়াও নাগলিঙম গাছকে ধরা হয় এক ধ্যানযোগ্য প্রতীক হিসেবে:

• এর ফুলে রয়েছে সৃষ্টি ও বিনাশের চক্রের প্রতিফলন

• সাপের প্রতীক ধরা হয় কুন্ডলিনী শক্তি হিসেবে

• শিবলিঙ্গ প্রতীক ধরা হয় ব্রহ্মচৈতন্যের কেন্দ্র হিসেবে

• এই গাছের নিচে ধ্যান করলে মনে নাকি একাগ্রতা আসে — এমন বিশ্বাসও রয়েছে



পরিশেষে এটুকুই বলা যায় গাছ পূজা ও পরিবেশ চেতনার ফলে নাগলিঙম গাছকে ঘিরে যে পবিত্রতার বোধ গড়ে উঠেছে, তা পরিবেশ সচেতনতা ও বৃক্ষরোপণ আন্দোলনের জন্যও ইতিবাচক। একে শুধু ধর্মীয় প্রতীক নয়, ‘পবিত্র প্রাকৃতিক উত্তরাধিকার’ হিসেবেও সংরক্ষণ করা উচিত।

©®তাপসকুমারপাল 



©®তাপসকুমারপাল

Comments

cd said…
Dada, opurba hoyeche lekhata...🙏🌹

Popular posts from this blog

একক বাদনের সুরে স্মরণে পণ্ডিত ভি. জি. যোগ

বৌদ্ধ মূর্তিতে কোঁকড়ানো চুলের রহস্য

টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার — কবিতা ও সঙ্গীত