তুই থেকে আপনি : অন্নপূর্ণা দেবীর মানবতার পাঠ
তুই থেকে আপনি : অন্নপূর্ণা দেবীর মানবতার পাঠ
©® প্রতিবেদনে -তাপস কুমার পাল
১৯৭৮/৭৯ সাল। আমার বাবাকে নিয়ে গুরুজী (পণ্ডিত ভি.জি. যোগ-) বোম্বাই (অধুনা মুম্বাই) যান। সেদিন তাঁরা পৌঁছেছিলেন কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী, মাইহার ঘরানার গৌরব অন্নপূর্ণা দেবীর ফ্ল্যাটে। প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, অন্নপূর্ণা দেবীর কাছে গুরুজীর ছোট ছেলে শ্রীকান্ত সেতার শিখতে যেতেন। যাইহোক....
ঘরের দরজা নিজের হাতে খুলে দিলেন অন্নপূর্ণা দেবী। শান্ত হাসিতে আহ্বান করলেন—
“আসুন, ভিতরে আসুন।”
সেদিন অনেকক্ষণ ধরে আলাপ চলল। গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক, সঙ্গীত সাধনা, জীবনের অভিজ্ঞতা—অসংখ্য বিষয়ে মগ্ন হয়ে পড়লেন তাঁরা।
এই সময় আমার বাবার চোখে পড়ল একটি অদ্ভুত দৃশ্য। যিনি চা জলখাবার দিয়ে গেলেন, বয়সে খুবই অল্প। অথচ তাঁকেও অন্নপূর্ণা দেবী “আপনি” বলে সম্বোধন করলেন।
বাবার মনে কৌতূহল জাগল। তিনি সযত্নে জিজ্ঞেস করলেন—
“মা, ওই মেয়েটি তো আপনার থেকে বয়সে অনেক ছোট। তাকে তুমি বললেও তো অসুবিধা নেই, তবে কেন আপনি?”
অন্নপূর্ণা দেবী মৃদু হাসলেন। তাঁর দৃষ্টি যেন অতীতে ভেসে গেল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন—
“জানেন, এর পেছনে একটা গল্প আছে…।”
তারপর তিনি শোনালেন শৈশবের সেই ঘটনা।
©® প্রতিবেদনে -তাপস কুমার পাল
মাইহারে গৃহপরিচারক ছিলেন রামু—এক ভাঙী মানুষ। চেহারায় সাদামাটা, স্বভাবে নীরব, কিন্তু কাজে ছিলেন নিখুঁত। প্রতিদিনের মতো তিনি বাড়িতে এসে চুপচাপ নিজের কাজ সেরে চলে যেতেন। সাধারণত তাঁর কাজে কারও হস্তক্ষেপ হতো না।
সেদিনও এরকমই এক সকাল। বাবা বাজারে গেছেন নিজের পছন্দের মাছ কিনতে, মা রান্নাঘরে ব্যস্ত। ঘরে এসেছে রামু। শান্তভাবে কাজে লেগে গেলেন তিনি। হঠাৎ কোনো কারণে বাবার কন্যা, অন্নপূর্ণা দেবী—তখনও তরুণী—রাগে ফেটে পড়লেন। ক্ষণিক আবেগে তিনি রামুকে নাম ধরে "তুইতোকারি" করে বকাবকি করলেন।
রামুর বুক হু হু করে উঠল। মানুষ যতই সাধারণ হোক, আত্মসম্মান তারও আছে। চোখে জল জমে উঠল। কিছু না বলে তিনি নীরবে কাজ সেরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ঠিক তখনই রাস্তায় বাবার সঙ্গে দেখা। হাতে মাছের ব্যাগ, কপালে ধ্যানী ভাব। রামু প্রণাম জানাতেই এক নজরে রামুর চোখ-মুখ দেখে থমকে গেলেন।
—“কী হয়েছে রামু? মুখ ভার কেন?”
প্রশ্ন করলেন বাবা।
রামু প্রথমে বলতে চাইছিলেন না। কিন্তু বাবার স্নেহ মিশ্রিত কণ্ঠে সাহস পেলেন। ভাঙা ভাঙা গলায় সব খুলে বললেন। জানালেন, অন্নপূর্ণা (বাবার মেয়ে) তাঁকে নাম ধরে তুইতোকারি করেছে, যা তাঁর মনে গভীর আঘাত দিয়েছে।
বাবা শোনামাত্রই স্থির হয়ে গেলেন। পরক্ষণেই যেন বজ্রপাত! কোনো দেরি না করে রামুকে নিয়ে ঘরে ফিরলেন।
মেয়েকে ডেকে পাঠালেন—
“অন্নপূর্ণা, তুমি রামুর সঙ্গে এমন ব্যবহার করেছ?”
অন্নপূর্ণা হতভম্ব। বাবার চোখে সে মুহূর্তে বজ্রের মতো রাগ, আবার ভিতরে শিশুর মতো মমতা। বাবা কঠোর গলায় বললেন—
“মানুষের মর্যাদা সর্বোচ্চ। ধনী-গরিব, ছোট-বড়—কেউ তুইতোকারি শুনতে বাধ্য নয়। তুমি আজই এক্ষুনি পা ধরে ক্ষমা চাইবে।”
অন্নপূর্ণা লজ্জায় মাথা নিচু করলেন। বাবার নির্দেশে তিনি রামুর পায়ে হাত দিয়ে ক্ষমা চাইলেন। প্রতিশ্রুতি দিলেন—আজ থেকে তিনি কাউকে অবমাননা করবেন না।
বাবা ধীর কণ্ঠে বললেন—
“স্মরণ রেখো, বিনয়ই মানুষের আসল অলঙ্কার। সঙ্গীত শেখার আগে মানুষকে সম্মান করতে শিখতে হবে।”
সেদিনের সেই শিক্ষা আজও আমার রক্তে মিশে আছে। সেই থেকে আমি আর কাউকে ‘তুই’ বলিনি—সবাই আমার কাছে ‘আপনি’।’’
অন্নপূর্ণা দেবীর কণ্ঠে ছিল গর্ব আর বিনয়ের মিশ্রণ। গল্প শোনার পর আমার বাবার মনে গভীর শ্রদ্ধা জাগল। তিনি বুঝলেন, ‘আপনি’ সম্বোধন অন্নপূর্ণা দেবীর কাছে কেবল ভদ্রতা নয়, ছিল মানবিকতার অঙ্গীকার।
এই ঘটনাই প্রমাণ করে—শুধু সুর নয়, মানবতাও ছিল মাইহার ঘরানার সাধনার কেন্দ্রবিন্দু। বাবা আলাউদ্দিন খাঁ তাঁর কন্যাকে যে শিক্ষা দিয়েছিলেন, তা আজও আমাদের শেখায়—মানুষকে সম্মান দেওয়াই শিল্পীর প্রথম সাধনা।
তাই বলা যায়, অন্নপূর্ণা দেবীর জীবনের প্রতিটি সম্বোধনে প্রতিধ্বনিত হতো তাঁর বাবার অমর শিক্ষা—“তুই থেকে আপনি।”
©® প্রতিবেদনে -তাপস কুমার পাল
Comments