বাংলার লোকায়ত জীবনে হারিয়ে যাওয়া হাতে লেখা পুজোর সংখ্যা

বাংলার লোকায়ত জীবনে হারিয়ে যাওয়া হাতে লেখা পুজোর সংখ্যা

©® প্রতিবেদনে - তাপস কুমার পাল

বাংলার গ্রামীণ সমাজে একসময় পুজো মানেই ছিল শুধু দেবদেবীর আরাধনা নয়, ছিল সামাজিক মিলনমেলা, সংস্কৃতির রঙিন আবহ। সেই আবহের অন্যতম আকর্ষণ ছিল হাতে লেখা “পুজোর সংখ্যা”।



গ্রামের স্কুলপড়ুয়া ছেলে-মেয়ে থেকে শুরু করে স্থানীয় কবি, কিশোর সাহিত্যপ্রেমী কিংবা নকশাদার লিখনের অনুরাগীরা – সবাই মিলে উৎসাহ নিয়ে বানাতো এই সংখ্যা। খাতার পাতায়, হাতের লেখায়, ছবি এঁকে, ছড়া-কবিতা লিখে, ছোটগল্প বা প্রবন্ধ সাজিয়ে তৈরি হতো পূজার বিশেষ সংখ্যা। কখনও সাইক্লোস্টাইল মেশিনে ছাপা, আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হাতে লেখা কপি গুনে গুনে বাঁধাই করে পরিবেশিত হতো।

এগুলি ছিল কেবলমাত্র সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র নয়; বরং পাড়ার মানুষের মধ্যে একতা ও সৃজনশীলতার অনন্য প্রতীক। সমাজে কার কেমন লেখনী প্রতিভা আছে, কার আঁকার হাত ভালো, কার গল্পে নতুনত্ব—সবই প্রকাশ পেত এইসব ছোট্ট প্রচেষ্টায়।

কালের প্রবাহে আজ আর সেই হাতের লেখা সংখ্যা খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রিন্টিং প্রেস, ডিজিটাল মিডিয়া আর সোশ্যাল নেটওয়ার্কের দৌলতে হাতে লেখা সংখ্যার জায়গা দখল করেছে ঝকঝকে পত্রিকা ও অনলাইন ই-ম্যাগাজিন। ফলে গ্রামীণ পুজো সংখ্যার সেই প্রাণবন্ততা ও আন্তরিকতার আবহ আজ অনেকটাই বিলীন হয়ে গেছে।

তবুও, যারা সেই সময়ের সাক্ষী, তাদের মনে আজও রয়ে গেছে স্মৃতি—বাঁধাই করা খাতার গন্ধ, কিশোর হৃদয়ের লেখা সরল কবিতা, আর পাড়ার সকলের মিলিত প্রয়াসে গড়ে ওঠা সৃজনশীলতার উজ্জ্বল নিদর্শন।



©® তাপস কুমার পাল

বালিগঞ্জ কসবা বোসপুকুরের হাতে লেখা পুজো সংখ্যা : কাশীনাথ পালের স্বপ্নযাত্রা

শারদোৎসবের দিন মানেই ঢাকের আওয়াজ, কাশফুলের দোলা আর আলোকিত অলিগলি। কিন্তু আমার কাছে এই উৎসবের আরেকটি অবিচ্ছেদ্য স্মৃতি রয়েছে—বোসপুকুরের হাতে লেখা পুজো সংখ্যা।

প্রতি বছর পূজার আগে বাড়িতে ব্যস্ততা শুরু হতো। একে একে এসে জমা পড়ত পাড়ার তরুণদের লেখা কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ। কেউ আবার রঙিন কাগজে নকশা আঁকত, কেউ পেনসিলে এঁকে দিত প্রচ্ছদের ছবি। ঘরে কালি-কলমের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত, যেন সে এক আলাদা উৎসব।



এই সমস্ত উদ্যোগের প্রাণ ছিলেন আমার জ্যাঠামশাই, কাশীনাথ পাল। তাঁর চোখে আমি দেখেছি স্বপ্নের দীপ্তি— তিনি বিশ্বাস করতেন, হাতে লেখা শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে মানুষের মনের আসল সুর। তিনি বারবার বলতেন, “মুদ্রিত অক্ষরে শৃঙ্খলা আছে বটে, কিন্তু হাতের লেখায় আছে হৃদয়ের উষ্ণতা।”

তাঁর ডাকেই সকলে একত্রিত হতো। পাড়ার ছেলেমেয়েরা সাইকেলের ঘণ্টা বাজিয়ে খাতাভর্তি লেখা নিয়ে হাজির হতো, কারও কবিতার পাতা কালি ছড়িয়ে ঝাপসা, কারও গল্পে অদ্ভুত বানান ভুল, তবুও জ্যাঠামশাই সেই ভুলকে হাসিমুখে গ্রহণ করতেন। তিনি বলতেন, “ভুলও এক রকম শৈলী, একদিন তা-ই হয়ে উঠবে অভিজ্ঞতা।”


রাত জেগে চলত সম্পাদনার কাজ। খাতার পাতাগুলো বাঁধাই করা হলে হাতে লেখা সেই সংখ্যাটি যেন হয়ে উঠত আমাদের সকলের মনের প্রতিচ্ছবি। পূজার দিন সকালে পাড়ার মানুষ যখন তা হাতে পেত, তাদের চোখে যে আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠত—তা কোনো ঝকঝকে ছাপানো বইয়ের সঙ্গে তুলনীয় নয়।

আজকের দিনে যখন চারপাশে শুধু মোবাইল স্ক্রিন আর ই-ম্যাগাজিনের ছটায় চোখ ঝলসে যায়, তখন সেই হাতের লেখা সংখ্যার কথা মনে পড়লেই বুকটা হুহু করে ওঠে। মনে হয়, প্রতিটি অক্ষরে যেন বাজত মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন, প্রতিটি আঁকায় ফুটে উঠত আবেগের রঙ।


বোসপুকুরের হাতে লেখা পুজো সংখ্যা কেবল একটি সাহিত্যিক প্রয়াস ছিল না, এটি ছিল আমাদের একতার প্রতীক, সাংস্কৃতিক বন্ধনের সেতু। আর তার নেপথ্যের নায়ক ছিলেন কাশীনাথ পাল—একজন মানুষ, যিনি প্রমাণ করেছিলেন যে হাতে লেখা শব্দও একদিন হয়ে উঠতে পারে উৎসবের প্রাণ।

©® তাপস কুমার পাল 



©®তাপস কুমার পাল 


Comments

Pampa said…
Osadharon. Dekhe ese chok sarthok

Popular posts from this blog

একক বাদনের সুরে স্মরণে পণ্ডিত ভি. জি. যোগ

বৌদ্ধ মূর্তিতে কোঁকড়ানো চুলের রহস্য

টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার — কবিতা ও সঙ্গীত