পুজোতে কর্পোরেট আগ্রাসন ও শারদীয় গানের বিলুপ্তি

পুজোতে কর্পোরেট আগ্রাসন ও শারদীয় গানের বিলুপ্তি


©® প্রতিবেদনে - তাপস কুমার পাল।



কলকাতায় দুর্গাপূজার সূচনা হয়েছিল বনেদিবাড়ির ঘরে ঘরে। আঠারো শতকে ইংরেজ শাসনের সময় জমিদার ও ধনীদের ঘরে ঘরে দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু হয়। এইসব পূজাকে বলা হতো সাবেকী বনেদিবাড়ির পুজো ।

বনেদিবাড়ির পুজো

প্রথম দিককার পূজাগুলি ছিল অভিজাত জমিদার পরিবারের প্রতিপত্তি ও ঐশ্বর্যের প্রদর্শন। ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায় যে, ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের জয় উপলক্ষে কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেব দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। ইংরেজ সাহেব থেকে দেশি অভিজাত—সবাই এই পূজার আমন্ত্রণ পেতেন। পরবর্তী সময়ে অন্যান্য বনেদিবাড়িও নিজেদের ঐতিহ্য রক্ষায় পূজা আয়োজন করতে থাকে। এসব পূজা ছিল মূলত পরিবারকেন্দ্রিক, জনসাধারণের প্রবেশাধিকার ছিল সীমিত।



বারোয়ারি পূজার সূচনা

উনিশ শতকের শেষভাগে সাধারণ মানুষের মধ্যে দুর্গাপূজা করার ইচ্ছা জাগতে থাকে। তখন অনেক গরিব বা মধ্যবিত্ত মানুষ ব্যক্তিগতভাবে পূজা করতে পারত না।
এভাবেই “বারোয়ারি পুজো ” বা “সর্বজনীন পুজো' র সূচনা হয়। “বারোয়ারি” শব্দের অর্থ বারো আর “ইয়ার” বা বন্ধু মিলে—অর্থাৎ বন্ধুদের উদ্যোগে পূজা। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৭৯০ সালে গঙ্গারাম মিত্রের উদ্যোগে কলকাতার বারাণগরে প্রথম বারোয়ারি পূজা অনুষ্ঠিত হয়। উনিশ শতকের মধ্যভাগে কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় সার্বজনীন পূজা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষত মধ্যবিত্ত সমাজে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে। বাগবাজার সার্বজনীন দুর্গোৎসবের সঙ্গে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু র নাম জড়িয়ে আছে।



বর্তমান প্রেক্ষাপট

আজ কলকাতার দুর্গাপূজা মূলত বারোয়ারি বা সার্বজনীন রূপেই সর্বাধিক প্রচলিত। শিল্পকলার নান্দনিকতায় থিম পুজো শুরু হয়, মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমার নতুন ধারা—সবকিছুই এখন এই বারোয়ারি পূজার মাধ্যমেই বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে গেছে। কলকাতার দুর্গাপূজা আজ শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বিশ্ববন্দিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বিশেষ পুরস্কারের ইতিহাস— এশিয়ান পেন্টস শারদ সম্মান।

১৯৮৫ সালের পূজোর আগে বহুজাতিক রঙের সংস্থা এশিয়ান পেন্টস কলকাতার দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এক অভিনব উদ্যোগ ঘোষণা করে। তাদের মূল বক্তব্য ছিল— “শুদ্ধ সূচি, সুস্থ রুচির সেরা বাছাই”। সে বছর সেপ্টেম্বর মাসে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে কলকাতার সমস্ত পূজো কমিটির কাছে আবেদন জানানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল, কলকাতার পূজাগুলির শিল্পকলা, রুচি ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নির্বাচন করা।

১৯৮৫ সালের দুর্গাপূজায় প্রথমবার এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। তৎকালীন বিখ্যাত শিল্পী, সাহিত্যিক ও সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা বিচারক হিসেবে অংশ নেন। প্রথম বছর তিনটি পূজা এই সম্মান লাভ করে—

• যোধপুর পার্ক
• আদি বালিগঞ্জ
• ম্যাডক্স স্কোয়ার

পুরস্কার ঘোষণার পর জনস্রোত ভিড় জমায় এই মণ্ডপগুলিতে। বহুজাতিক সংস্থার এই উদ্যোগ প্রবল সাফল্য লাভ করে এবং পরে একে একে আরও অনেক সংস্থা দুর্গাপূজাকে ঘিরে নিজেদের ব্র্যান্ড প্রচারে ঝুঁকে পড়ে।

১৯৮৫ সাল থেকে প্রতিবছর তিনটি পূজামণ্ডপকে “শ্রেষ্ঠ পূজা” হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এখানে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থান নেই—তিনটি পূজাকেই সমান মর্যাদায় সম্মানিত করা হয়। মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমার নান্দনিকতা, আলোকসজ্জা, পরিবেশরক্ষা ও সামগ্রিক শিল্পমানের ভিত্তিতেই এই পুরস্কার দেওয়া হয়।

প্রথম দিকে কেবলমাত্র কলকাতার বিখ্যাত মণ্ডপগুলিই এই সম্মান পেত। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক অখ্যাত ও ছোট মণ্ডপও নিজেদের সৃজনশীলতা ও রুচিশীলতার কারণে এই পুরস্কার অর্জন করেছে।

আজ দুর্গাপূজা আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত। ডিসেম্বর ২০২১ সালে UNESCO কলকাতার দুর্গাপূজাকে Intangible Cultural Heritage of Humanity হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে এশিয়ান পেন্টস শারদ সম্মান এখন এক ঐতিহাসিক মাইলফলক, যা শুধু পূজার শিল্পমানকে উৎসাহিত করে না, বরং কলকাতার দুর্গাপূজাকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেও গণ্য হয়।




কর্পোরেট আগ্রাসনে শারদীয় গানের বিলুপ্তি


দুর্গোৎসবে সঙ্গীত ও তার চর্চায় দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটেছে, যা লোকজ ঐতিহ্য থেকে আধুনিক ফিউশন, সিনেমাটিক গান এবং থিম মিউজিক এ প্রসারিত হয়েছে। দেবী দুর্গার আরাধনার অষ্টাদশ শতকে (১৭০০-এর দশক) নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নতুন রীতি আনেন এবং দুর্গোৎসব চালু করেন—এর সংগীত তখন মূলত ধর্মীয় গান, ঢাক-ঢোল, কীর্তনেই সীমাবদ্ধ ছিল।


উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুতে সর্বজনীন দুর্গাপূজা জনপ্রিয় হতে থাকে, তখন থেকেই লোকসঙ্গীত, ব্রাহ্ম সঙ্গীত, নাটকের গান ও নবকলেবরে শ্যামাসংগীত প্রথাগত সঙ্গীতকে ছাড়িয়ে যেতে থাকে। বিশ শতকের মাঝামাঝি (বিশেষত ১৯৪০-এর দশকের দেশভাগ ও স্বাধীনতার প্রেক্ষিতে) দুর্গোৎসব আরও সর্বজনীন ও জনপ্রিয় বিনোদন-ভিত্তিক হয়ে ওঠে; সামাজিক গান, নাট্যসঙ্গীত, এবং দেশাত্মবোধক গানও সংযোজিত হয়। গত ৩০–৪০ বছরে থিম প্যান্ডেল ও ডিজে মিউজিক, ফিউশন ও পপ, সিনেমাভিত্তিক গান দুর্গোৎসবের আমেজে আধুনিকতা এনেছে, তেমনিই এই পুঁজিবাদের জন্য ধ্বংস হয়েছে পুজোর গান

এক সময় দুর্গাপুজো মানেই ছিল নতুন গান। ষাট থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত পূজাবার্ষিকীর পাশাপাশি বাজারে আসত ‘পুজোর অ্যালবাম’। শ্রোতাদের কাছে এগুলো ছিল এক বিশেষ আকর্ষণ, কারণ বছর জুড়ে এই সময়েই প্রকাশ পেত নতুন গান।


১৯৬০-এর দশক

এই সময় পুজোর গান মূলত প্রকাশিত হত গ্রামোফোন রেকর্ডে। শচীন দেব বর্মণ, সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রমুখ সঙ্গীত পরিচালকের হাত ধরে পুজোর গান জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, মান্না দে, হেমন্ত— এঁদের কণ্ঠে অনেক গানই শ্রোতাদের মনে দাগ কাটে। এই সময় পুজোর গান চিরকালীন গ্রহণ যোগ্য।


১৯৭০-এর দশক

এই সময় থেকে পুজোর অ্যালবামের রমরমা আরও বাড়ে। সুধীন দাশগুপ্ত, সত্যজিৎ রায়, রাহুল দেব বর্মণ প্রমুখ পুজোর গানকে নতুন আঙ্গিক দেন। গান হয়ে ওঠে বাঙালির উৎসবের অন্যতম অঙ্গ। এই সময় জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে ছিল “এই পথ যদি না শেষ হয়” যা প্রতিটি প্যান্ডেলে সোনা যেতো। রেকর্ডের যুগের অবসান ক্যাসেটের যুগের সন্ধিক্ষণ।



১৯৮০-এর দশক

এই সময় ক্যাসেট সংস্কৃতির আগমনে পুজোর গান আরও সহজলভ্য হয়ে ওঠে। আরতি মুখোপাধ্যায়, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, উষা উত্থুপ সহ অনেক শিল্পী নিয়মিত পুজোর অ্যালবামে গান করেন। এই সময়ের অ্যালবামগুলো পাড়ায় পাড়ায় বাজত মাইক-সাউন্ডে। গান হয়ে উঠত দুর্গাপুজোর আগমনী বার্তা।


১৯৯০-এর দশক

পুজোর গান প্রকাশের সোনালি যুগ।কবির সুমন এপ্রিল ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় 'তোমাকে চাই... তারপর বাদবাকি টা ইতিহাস।  বাঙলা গানে খরা কাটিয়ে প্রাণের সঞ্চার হিয়। তার' নচিকেতা চক্রবর্তীর জীবনমুখী গান প্লাবিত হয় বাঙ্গালির মনে হৃদয়ে এমন কি পুজো প্যান্ডেলে।। এঁদের মতো শিল্পীরা একে একে উপহার দিতে থাকেন।“এই নিশি রাত্রি” বা “বৃদ্ধাশ্রম” ধরনের গান প্রথম শোনা গিয়েছিল পুজোর অ্যালবাম।

নব্বইয়ের মাঝামাঝি থেকে এশিয়ান পেইন্টস পুজো পুরস্কার শুরু হয়। এরপর থেকে মানুষের আকর্ষণ ধীরে ধীরে গানের থেকে সরে গিয়ে বেশি ঝুঁকতে থাকে প্যান্ডেল হপিং, আলোকসজ্জা ও থিম প্রতিযোগিতায়। এশিয়ান পেন্টস এর  শুদ্ধ সূচি, সুস্থ রুচির সেরা বাছাই” প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য প্রথম দিকে সানাই, সেতার, সরোদ, বেহালা এমনকি বাঁশি পর্যন্ত বাজানোর চল হল। তারপর ভাবনা হলো পেন্ডেল থিম অনুযায়ী মিউজিক তৈরি করা,  বহু আনকোরা শিল্পী থেকে প্রতিষ্ঠিত শিল্পী রা ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তার ফলে তৈরি হল সব থেকে ক্ষণাজন্মা সঙ্গীত,  যা ওই পুজোর ক'দিন ই সেই পেন্ডেলে বাজে তার আর তার খোঁজ খবর রাখেন না কেউ, এই মিউজিকের একটা মজার ব্যাপার হলো, আপনি যে মণ্ডপে ঢুকে ঠাকুর দেখছেন সেখানেই বাজানো হচ্ছে, তার যেই বাইরে বেরলেন ভুলে গেলেন। আর অন্য কোনো পুজো কমিটি ওই মিউজিক বাজানোর অনুমতি পায় না।এখনো গান তৈরি হয়, শিল্পীরা সুর দেন, কিন্তু ‘পুজোর গান’ বলে আলাদা করে কোনো সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি হয় না। টেলিভিশন, এফএম রেডিও এবং পরে ডিজিটাল মাধ্যমে গানের বাজার চলে যায় নতুন দিকে। পুজোর জন্য আলাদা অ্যালবাম প্রকাশের ধারা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।



"রেকর্ড সঙ্গীত" বইটিও কালের গর্ভে প্রবেশ করেছে

রেকর্ড সঙ্গীত বই ছিল বার্ষিকী স্মারক বই। যেখানে পুজোর নতুন গান, গানের কথা, শিল্পী, গীতিকার-সুরকারের নাম এবং সংশ্লিষ্ট রেকর্ড নম্বর তালিকাভুক্ত থাকত। এই বইটি সাধারণত গ্রামোফোন কোম্পানি অব ইন্ডিয়া (His Master's Voice—HMV), কলকাতা, কলম্বিয়া, হিন্দুস্তান রেকর্ডস প্রভৃতি রেকর্ডিং সংস্থার পক্ষ থেকে প্রকাশিত হত এবং পুজোর গানের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।




"রেকর্ড সঙ্গীত" বইটিতে থাকত বছরে প্রকাশিত নতুন (বিশেষত পুজোর) গানের লিরিক্সসংশ্লিষ্ট শিল্পী, গীতিকার, সুরকারের নামরেকর্ড নম্বর ও ক্যাটালগ তথ্য। শিল্পীদের ছবি ও জীবনী সংক্ষিপ্ত বিবরণ। “শারদ অর্ঘ্য”—এই নামেই ১৯৬০ সাল থেকে প্রকাশিত হতে থাকে HMV-এর বার্ষিকী গান প্রেমীদের জন্য। এটি ছিল ম্যাগাজিন আকৃতির, ৩০-৩৬ পাতার রঙিন/সাদাকালো ছাপা বার্ষিকী বই। এই “রেকর্ড সঙ্গীত বই” হয়ে উঠেছিল শিল্পী, সুরকার আর শ্রোতার মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। অনেকে এই বই সংগ্রহ করে রাখতেন, কারণ এতে গানের পাশাপাশি শিল্পী-সুরকারদেরও বিস্তৃত তথ্য, ছবি, রেকর্ড নম্বর সংবলিত মূল্যবান তথ্য থাকত, যা অন্য কোথাও সহজে মিলতো না।


পঞ্চাশ-ষাটের দশক থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত পুজোর নতুন গান প্রকাশ ছিল বাঙালির বার্ষিক উন্মাদনা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, লতা মঙ্গেশকর, কিশোর কুমার সবাই পুজোর অ্যালবামের মাধ্যমে হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। এই গানগুলো শুধু উৎসবকে সঙ্গীতময় করেনি, বাঙালির স্মৃতিতে অমর হয়ে থেকেছে। একদিন যে পুজোর গান ছিল দুর্গাপুজোর প্রাণের উৎসব, আজ তা সোনালি স্মৃতি হয়ে গেছে। পুজো মানেই এখন আলো, থিম আর প্রতিযোগিতা। অথচ এক সময় এই উৎসবকে ঘিরেই বাংলা সংগীত পেয়েছিল বহু অমর সৃষ্টি।






Comments

Popular posts from this blog

একক বাদনের সুরে স্মরণে পণ্ডিত ভি. জি. যোগ

বৌদ্ধ মূর্তিতে কোঁকড়ানো চুলের রহস্য

টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার — কবিতা ও সঙ্গীত