বাংলার রহস্যময় লোকঐতিহ্য : যে গ্রামে পঞ্জিকা মেনে দুর্গাপূজা হয় না
বাংলার রহস্যময় লোকঐতিহ্য : যে গ্রামে পঞ্জিকা মেনে দুর্গাপূজা হয় না
©® প্রতিবেদনে - তাপস কুমার পাল।
বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে পূজা-পার্বণ কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং সামাজিক বন্ধন ও লোকবিশ্বাসের জীবন্ত বহিঃপ্রকাশ। তেমনই পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলায় মোট ২৩৩৭টি গ্রামের মধ্যে "ভুলুই গ্রাম" একটি ছোট জনপদ হলেও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই গ্রামে অবস্থিত অষ্টনায়িকা দুর্গা মন্দির বহু পুরনো ও জাগ্রত মন্দির হিসেবে পরিচিত। দুর্গা পুজোর সময় মন্দির চত্বর ও আশেপাশের গ্রামজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং অসংখ্য ভক্ত সমবেত হন। এই মন্দিরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো— "এখানে পুজো প্রচলিত পঞ্জিকা অনুযায়ী হয় না"। বরং স্থানীয় একজন জ্যোতিষীর নির্ধারিত সময় অনুসারে পুজোর নির্ঘণ্ট ঠিক করা হয়। বিশেষত অষ্টমী ও সন্ধিপুজোর সময় সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
এই মন্দির সম্বন্ধে মাননীয় কৌশিক মৈত্র মশাই জানিয়েছেন --
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন জগদ্রাম রায়। স্বভাব-কবি হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন সাধক। দেবী দুর্গার সাধক। যৌবনেই গৃহত্যাগী হন। দামোদর নদের তীরে দেবী দুর্গার সাধনা শুরু করেন ভক্ত কবি জগদ্রাম রায়। দেবী দর্শনও হয় তাঁর। পরে কাশীপুরের রাজার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন তিনি। কাশীপুরে থাকাকালীন তিনি একটি রামায়ণ রচনা করেন। এই রামায়ণে আটটি 'কাণ্ড' আছে , তাই এই মহাকাব্যকে 'অদ্ভুত রামায়ণ' বলা হয় । তবে যাই হোক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর রচিত রামায়ণ 'জগদ্রামী রামায়ণ' নামেই পরিচিত হয়েছে।
পরবর্তী সময়গুলিতে কাশীপুরের রাজার আনুকূল্যে বাঁকুড়ার মেজিয়া থানার ভুলুই গ্রামে আনুমানিক ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি একটি মন্দির নির্মাণ করেন ও সেখানেই সাধনা চালিয়ে যেতে থাকেন । তিনি তাঁর অন্তর্দৃষ্টিতে দেবী দুর্গার যে রূপ দেখেছিলেন, সেইমতোই মন্দিরেই দেবীকে প্রতিষ্ঠিত করেন । দেবীর নাম হল 'অষ্টনায়িকা'। ।আজও এই মন্দিরে পূজিত হচ্ছেন দেবী 'অষ্টনায়িকা দুর্গা' ।
লোকসংস্কৃতি গবেষকদের কাছে কবি জগদ্রাম রায় ও তাঁর রচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । এক সময় এই পুজোর প্রসার ছিল অনেক বেশি। দূর দূরান্ত থেকে আসতেন অগণিত পুণ্যার্থী। আজও সাধক কবির মন্দিরে আসেন অগণিত দর্শক। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও আজও এই মন্দিরে ভক্তদের ধরা দেন তিনি ।
কবি জগদ্রাম রায়। প্রয়াত হয়েছেন বহুকাল আগে। তাঁর রচিত 'অদ্ভুত রামায়ণ', 'শ্রীদূর্গা পঞ্চরাত্রি', 'আত্মবোধ' প্রভৃতি আস্তে আস্তে ভুলতে বসেছে আজকের এই যান্ত্রিক প্রজন্ম । কালের গভীরে হারিয়ে যেতে বসেছেন মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সাধক ও কবি জগদ্রাম রায় ।
কবি জগদ্রাম রায় ও রামপ্রসাদ রায় বিরচিত রামায়ণের অংশ বিশেষ ।
----------------------------------------------
॥ রাবণ-মন্দোদরী সংবাদ॥
.
রাণী বলে রাম ব্রহ্ম না বটেন যদি।
পঞ্চবর্ষে তাড়কা বধিলা কোন বিধি॥
রাজা বলে সেটা ছিল বৃদ্ধানী রাক্ষসী।
উঝট খাইয়া ম্যলো রামে কি প্রশংসি॥
রাণী বলে পদধূলে শিলা হৈল নর।
রাজা বলে শাঁপ কালে মুনি দিলা বর॥
রাণী কয় হরধনু ভাঙ্গিলেন হেলে।
রাজা কয় ঘুনধরা বাঁশ ভাঙ্গে ছুলে॥
রাণী বলে আপনি ত মিথিলা গেছিলে।
জীর্ণ ধনু ভাঙ্গি কেনে সীতা না আনিলে॥
রাজা বলে না বুঝ অবোধ তুমি বট।
সে ধনু ভাঙ্গিয়া করি নিজৈশ্বর্য খাট॥...
রাণী কয় কৈলা ক্ষয় খর দূষণেরে।
রাজা বলে তারা মৈল মদিরার ঘোরে॥
রাণী বলে রাম বাণে বালী বীর মৈল।
রাজা কহে তাও নয় চোরা বাণে ম্যেল॥...
রাণী বলে নর কপি এ্যলো কেনে লঙ্কা।
রাক্ষস বলিয়া মনে না করিল শঙ্কা॥
রাজা বলি চুলে ধরি কালে লৈয়া এ্যল।
ঘরে বৈয়া আহার আনিয়া বিধি দিল॥
এই নানা প্রপঞ্চেতে প্রবোধি রাণীরে।
মন্দোদরী নিজ মাথে করাঘাত মারে॥
অষ্টনায়িকা পুজোর বিশেষত্ব
এই পুজো দেবীর আটটি রূপকে কেন্দ্র করে পালিত হয়। গ্রামের মানুষদের বিশ্বাস, এই আট রূপেই দেবী মাতৃশক্তির পূর্ণতা প্রকাশ করেন। পূজার দিনগুলোতে গোটা গ্রাম ভরে ওঠে ভক্তি, আনন্দ ও লোকোৎসবের আবহে।
অষ্টনায়িকার নাম ও পরিচয়
"অষ্টনায়িকা" শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘অষ্ট’ (আট) + ‘নায়িকা’ (নায়িকা বা নারী চরিত্র) থেকে। অষ্ট-নায়িকা শ্রেণিবিভাগ (নায়িকা-ভেদ) প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় নাট্যশাস্ত্রে। পরবর্তীতে দশরূপক, সাহিত্যদর্পণ, কুট্টনিমতা, অনঙ্গরঙ্গ, স্মরদীপিকা, রসিকপ্রিয়া প্রভৃতি গ্রন্থে এর বিশদ বর্ণনা মেলে।
চিত্রকলা, সাহিত্য, ভাস্কর্য ও শাস্ত্রীয় নৃত্যে অষ্ট-নায়িকা বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। মধ্যযুগীয় রাগমালা চিত্রকর্ম (যেমন বুন্দি ঘরানা), জয়দেবের গীতগোবিন্দ, বৈষ্ণব কবিদের রচনায় রাধার নায়িকা-রূপ এদের উদাহরণ। হিমাচলের চম্বা রুমাল সূচিকর্মে অষ্ট-নায়িকা অন্যতম থিম। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বিশেষত ঠুমরিতে রাধার নানান মেজাজকেও এই অষ্ট-নায়িকা রূপে প্রকাশ করা হয়। আর ভুলুই গ্রামের অষ্টনায়িকা দুর্গা পুজোয় এই আট নায়িকার প্রতিই আলাদা আলাদা ভক্তি নিবেদন করা হয়।
©® প্রতিবেদনে - তাপস কুমার পাল।
বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতিতে পূজা-পার্বণ কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং সামাজিক বন্ধন ও লোকবিশ্বাসের জীবন্ত বহিঃপ্রকাশ। তেমনই পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলায় মোট ২৩৩৭টি গ্রামের মধ্যে "ভুলুই গ্রাম" একটি ছোট জনপদ হলেও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এই গ্রামে অবস্থিত অষ্টনায়িকা দুর্গা মন্দির বহু পুরনো ও জাগ্রত মন্দির হিসেবে পরিচিত। দুর্গা পুজোর সময় মন্দির চত্বর ও আশেপাশের গ্রামজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং অসংখ্য ভক্ত সমবেত হন। এই মন্দিরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো— "এখানে পুজো প্রচলিত পঞ্জিকা অনুযায়ী হয় না"। বরং স্থানীয় একজন জ্যোতিষীর নির্ধারিত সময় অনুসারে পুজোর নির্ঘণ্ট ঠিক করা হয়। বিশেষত অষ্টমী ও সন্ধিপুজোর সময় সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
এই মন্দির সম্বন্ধে মাননীয় কৌশিক মৈত্র মশাই জানিয়েছেন --
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন জগদ্রাম রায়। স্বভাব-কবি হওয়ার পাশাপাশি তিনি ছিলেন সাধক। দেবী দুর্গার সাধক। যৌবনেই গৃহত্যাগী হন। দামোদর নদের তীরে দেবী দুর্গার সাধনা শুরু করেন ভক্ত কবি জগদ্রাম রায়। দেবী দর্শনও হয় তাঁর। পরে কাশীপুরের রাজার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন তিনি। কাশীপুরে থাকাকালীন তিনি একটি রামায়ণ রচনা করেন। এই রামায়ণে আটটি 'কাণ্ড' আছে , তাই এই মহাকাব্যকে 'অদ্ভুত রামায়ণ' বলা হয় । তবে যাই হোক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর রচিত রামায়ণ 'জগদ্রামী রামায়ণ' নামেই পরিচিত হয়েছে।
পরবর্তী সময়গুলিতে কাশীপুরের রাজার আনুকূল্যে বাঁকুড়ার মেজিয়া থানার ভুলুই গ্রামে আনুমানিক ১৭৪৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি একটি মন্দির নির্মাণ করেন ও সেখানেই সাধনা চালিয়ে যেতে থাকেন । তিনি তাঁর অন্তর্দৃষ্টিতে দেবী দুর্গার যে রূপ দেখেছিলেন, সেইমতোই মন্দিরেই দেবীকে প্রতিষ্ঠিত করেন । দেবীর নাম হল 'অষ্টনায়িকা'। ।আজও এই মন্দিরে পূজিত হচ্ছেন দেবী 'অষ্টনায়িকা দুর্গা' ।
লোকসংস্কৃতি গবেষকদের কাছে কবি জগদ্রাম রায় ও তাঁর রচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । এক সময় এই পুজোর প্রসার ছিল অনেক বেশি। দূর দূরান্ত থেকে আসতেন অগণিত পুণ্যার্থী। আজও সাধক কবির মন্দিরে আসেন অগণিত দর্শক। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও আজও এই মন্দিরে ভক্তদের ধরা দেন তিনি ।
কবি জগদ্রাম রায়। প্রয়াত হয়েছেন বহুকাল আগে। তাঁর রচিত 'অদ্ভুত রামায়ণ', 'শ্রীদূর্গা পঞ্চরাত্রি', 'আত্মবোধ' প্রভৃতি আস্তে আস্তে ভুলতে বসেছে আজকের এই যান্ত্রিক প্রজন্ম । কালের গভীরে হারিয়ে যেতে বসেছেন মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সাধক ও কবি জগদ্রাম রায় ।
কবি জগদ্রাম রায় ও রামপ্রসাদ রায় বিরচিত রামায়ণের অংশ বিশেষ ।
----------------------------------------------
॥ রাবণ-মন্দোদরী সংবাদ॥
.
রাণী বলে রাম ব্রহ্ম না বটেন যদি।
পঞ্চবর্ষে তাড়কা বধিলা কোন বিধি॥
রাজা বলে সেটা ছিল বৃদ্ধানী রাক্ষসী।
উঝট খাইয়া ম্যলো রামে কি প্রশংসি॥
রাণী বলে পদধূলে শিলা হৈল নর।
রাজা বলে শাঁপ কালে মুনি দিলা বর॥
রাণী কয় হরধনু ভাঙ্গিলেন হেলে।
রাজা কয় ঘুনধরা বাঁশ ভাঙ্গে ছুলে॥
রাণী বলে আপনি ত মিথিলা গেছিলে।
জীর্ণ ধনু ভাঙ্গি কেনে সীতা না আনিলে॥
রাজা বলে না বুঝ অবোধ তুমি বট।
সে ধনু ভাঙ্গিয়া করি নিজৈশ্বর্য খাট॥...
রাণী কয় কৈলা ক্ষয় খর দূষণেরে।
রাজা বলে তারা মৈল মদিরার ঘোরে॥
রাণী বলে রাম বাণে বালী বীর মৈল।
রাজা কহে তাও নয় চোরা বাণে ম্যেল॥...
রাণী বলে নর কপি এ্যলো কেনে লঙ্কা।
রাক্ষস বলিয়া মনে না করিল শঙ্কা॥
রাজা বলি চুলে ধরি কালে লৈয়া এ্যল।
ঘরে বৈয়া আহার আনিয়া বিধি দিল॥
এই নানা প্রপঞ্চেতে প্রবোধি রাণীরে।
মন্দোদরী নিজ মাথে করাঘাত মারে॥
অষ্টনায়িকা পুজোর বিশেষত্ব
এই পুজো দেবীর আটটি রূপকে কেন্দ্র করে পালিত হয়। গ্রামের মানুষদের বিশ্বাস, এই আট রূপেই দেবী মাতৃশক্তির পূর্ণতা প্রকাশ করেন। পূজার দিনগুলোতে গোটা গ্রাম ভরে ওঠে ভক্তি, আনন্দ ও লোকোৎসবের আবহে।
অষ্টনায়িকার নাম ও পরিচয়
"অষ্টনায়িকা" শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘অষ্ট’ (আট) + ‘নায়িকা’ (নায়িকা বা নারী চরিত্র) থেকে। অষ্ট-নায়িকা শ্রেণিবিভাগ (নায়িকা-ভেদ) প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় নাট্যশাস্ত্রে। পরবর্তীতে দশরূপক, সাহিত্যদর্পণ, কুট্টনিমতা, অনঙ্গরঙ্গ, স্মরদীপিকা, রসিকপ্রিয়া প্রভৃতি গ্রন্থে এর বিশদ বর্ণনা মেলে।
চিত্রকলা, সাহিত্য, ভাস্কর্য ও শাস্ত্রীয় নৃত্যে অষ্ট-নায়িকা বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। মধ্যযুগীয় রাগমালা চিত্রকর্ম (যেমন বুন্দি ঘরানা), জয়দেবের গীতগোবিন্দ, বৈষ্ণব কবিদের রচনায় রাধার নায়িকা-রূপ এদের উদাহরণ। হিমাচলের চম্বা রুমাল সূচিকর্মে অষ্ট-নায়িকা অন্যতম থিম। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বিশেষত ঠুমরিতে রাধার নানান মেজাজকেও এই অষ্ট-নায়িকা রূপে প্রকাশ করা হয়। আর ভুলুই গ্রামের অষ্টনায়িকা দুর্গা পুজোয় এই আট নায়িকার প্রতিই আলাদা আলাদা ভক্তি নিবেদন করা হয়।
অষ্টনায়িকার রূপসমূহ
১. স্বধীনভর্তৃকা নায়িকা – স্বামীর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও কর্তৃত্বশীল রূপ।
২. বিপ্রলব্ধা নায়িকা – প্রতারিত বা ব্যর্থ প্রেমে বেদনাহত রূপ।
৩. কণ্ঠিত নায়িকা – প্রেমিকের আগমনের প্রতীক্ষায় উদগ্রীব রূপ।
৪. উৎকণ্ঠিতা নায়িকা – অনিশ্চয়তায় কাতর, আসবে কি আসবে না—এই উৎকণ্ঠার প্রতীক।
৫. খণ্ডিতা নায়িকা – বিরক্ত বা রুষ্ট রূপ; প্রতারণা সহ্য করতে না-পারা।
৬. অভিসারিকা নায়িকা – সমস্ত বাধা অগ্রাহ্য করে প্রিয়জনের কাছে ছুটে যাওয়া সাহসী রূপ।
৭. প্রোষিতপতিকা নায়িকা – দূরে থাকা প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষমান, বিচ্ছেদের রূপ।
৮. বাসকসজ্জা নায়িকা – সজ্জিত হয়ে প্রিয়জনকে অভ্যর্থনা জানানোর প্রস্তুত রূপ।
এই আট নায়িকা আসলে জীবনের আট রকম আবেগ, প্রেম-বিরহ, আনন্দ-বেদনার প্রতীক। পূজার মাধ্যমে বোঝানো হয়—মানবজীবনের প্রতিটি অনুভূতিই দেবীর লীলা।
পরবর্তী বছরের সন্ধি পূজার ঘোষণা
অষ্টনায়িকা পূজার এক ব্যতিক্রমী দিক হলো পুজো সমাপ্তির সময় গ্রামের পুরোহিত বা কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেন – আগামী বছরে সন্ধি পূজা ঠিক কোন দিন ও মুহূর্তে অনুষ্ঠিত হবে। সাধারণভাবে ভাবলে এটি হয়তো একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা মাত্র। কিন্তু বাস্তবে এর অন্তরালে আছে এক গভীর তাৎপর্য।
দৈবীলীলার রহস্য
সন্ধি পুজো নির্ভর করে শাস্ত্রসম্মত তিথি, নক্ষত্র ও মুহূর্ত গণনার উপর। এই জ্যোতিষশাস্ত্রীয় জটিলতা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সহজ নয়। ফলে গ্রামীণ সমাজে এই ঘোষণাকে দেবীর ইচ্ছার প্রতিফলন বলেই মনে করা হয়।
এ যেন ভক্তদের কাছে এক দৈবীলীলা—যেখানে সময়ও দেবী নিজেই নির্ধারণ করছেন।
লোকবিশ্বাস ও সমাজজীবন
এই প্রথা শুধু পুজোর অংশ নয়, বরং গ্রামবাসীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও সামাজিক ঐক্যের প্রতীক। আগামী বছরের পুজোর সময় জেনে তারা নতুন আশায় পথচলা শুরু করেন। ভুলুই গ্রামের অষ্টনায়িকা দুর্গাপূজা তাই শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা গ্রামীণ সমাজজীবন ও লোকবিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
১. স্বধীনভর্তৃকা নায়িকা – স্বামীর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও কর্তৃত্বশীল রূপ।
২. বিপ্রলব্ধা নায়িকা – প্রতারিত বা ব্যর্থ প্রেমে বেদনাহত রূপ।
৩. কণ্ঠিত নায়িকা – প্রেমিকের আগমনের প্রতীক্ষায় উদগ্রীব রূপ।
৪. উৎকণ্ঠিতা নায়িকা – অনিশ্চয়তায় কাতর, আসবে কি আসবে না—এই উৎকণ্ঠার প্রতীক।
৫. খণ্ডিতা নায়িকা – বিরক্ত বা রুষ্ট রূপ; প্রতারণা সহ্য করতে না-পারা।
৬. অভিসারিকা নায়িকা – সমস্ত বাধা অগ্রাহ্য করে প্রিয়জনের কাছে ছুটে যাওয়া সাহসী রূপ।
৭. প্রোষিতপতিকা নায়িকা – দূরে থাকা প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষমান, বিচ্ছেদের রূপ।
৮. বাসকসজ্জা নায়িকা – সজ্জিত হয়ে প্রিয়জনকে অভ্যর্থনা জানানোর প্রস্তুত রূপ।
এই আট নায়িকা আসলে জীবনের আট রকম আবেগ, প্রেম-বিরহ, আনন্দ-বেদনার প্রতীক। পূজার মাধ্যমে বোঝানো হয়—মানবজীবনের প্রতিটি অনুভূতিই দেবীর লীলা।
পরবর্তী বছরের সন্ধি পূজার ঘোষণা
অষ্টনায়িকা পূজার এক ব্যতিক্রমী দিক হলো পুজো সমাপ্তির সময় গ্রামের পুরোহিত বা কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেন – আগামী বছরে সন্ধি পূজা ঠিক কোন দিন ও মুহূর্তে অনুষ্ঠিত হবে। সাধারণভাবে ভাবলে এটি হয়তো একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা মাত্র। কিন্তু বাস্তবে এর অন্তরালে আছে এক গভীর তাৎপর্য।
দৈবীলীলার রহস্য
সন্ধি পুজো নির্ভর করে শাস্ত্রসম্মত তিথি, নক্ষত্র ও মুহূর্ত গণনার উপর। এই জ্যোতিষশাস্ত্রীয় জটিলতা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সহজ নয়। ফলে গ্রামীণ সমাজে এই ঘোষণাকে দেবীর ইচ্ছার প্রতিফলন বলেই মনে করা হয়।
এ যেন ভক্তদের কাছে এক দৈবীলীলা—যেখানে সময়ও দেবী নিজেই নির্ধারণ করছেন।
লোকবিশ্বাস ও সমাজজীবন
এই প্রথা শুধু পুজোর অংশ নয়, বরং গ্রামবাসীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও সামাজিক ঐক্যের প্রতীক। আগামী বছরের পুজোর সময় জেনে তারা নতুন আশায় পথচলা শুরু করেন। ভুলুই গ্রামের অষ্টনায়িকা দুর্গাপূজা তাই শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, যা গ্রামীণ সমাজজীবন ও লোকবিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
©® তাপস কুমার পাল
Comments