বাংলায় হারিয়ে যাওয়া উপাধি

বাংলায় হারিয়ে যাওয়া উপাধি 

©®তাপস কুমার পাল




বাংলার ইতিহাসে উপাধি বা খেতাব শুধু শব্দমাত্র ছিল না, ছিল সম্মান, গৌরব ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। কোনোটি ছিল প্রশাসনিক ক্ষমতার দস্তখত, কোনোটি ছিল জ্ঞানের আলোয় দীপ্ত স্বীকৃতি, আবার কোনোটি ছিল রাজা বা শাসকের কৃপাপ্রাপ্ত বিশেষ সম্মান। এই উপাধিগুলি মানুষকে সমাজে আলাদা মর্যাদায় স্থাপন করত, পরিবার ও বংশের গৌরব বাড়াত। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সমাজব্যবস্থা বদলেছে, রাজনীতি পাল্টেছে, জমিদারি উঠে গেছে, ঔপনিবেশিক শাসন শেষ হয়েছে। ফলে সেই সব গৌরবময় উপাধি আজ ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তবুও সেগুলি আমাদের ঐতিহ্যের মূল্যবান অংশ, যেখান থেকে আমরা বুঝতে পারি সমাজ কোন পথে এগিয়েছে আর কিভাবে মানুষের অবস্থান ও সম্মান বদলেছে।



©®তাপস কুমার পাল 

জমিদার থেকে তালুকদার: ভূমি-রাজস্বের খেতাব


বাংলার গ্রামীণ জীবন বহু শতাব্দী ধরে জমিদারি প্রথার উপর দাঁড়িয়ে ছিল। গ্রামাঞ্চলের সামাজিক কাঠামো থেকে শুরু করে অর্থনীতি—সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ ছিল এই খেতাবধারী জমিদার ও তাদের অধীনস্ত রাজস্বকর্মীদের হাতে। জমি তখন শুধু চাষাবাদের ক্ষেত্র নয়, ছিল প্রভুত্বের প্রতীক এবং সামাজিক অবস্থানের নির্ণায়ক।

জমিদার: জমিদার ছিলেন শুধু জমির মালিক নন, গ্রামের অভিভাবক ও শাসকও বটে। গ্রামীণ আদালত, বিবাদ মীমাংসা থেকে শুরু করে উৎসব-পার্বণের ব্যয়ভার—সবকিছুতেই জমিদারের প্রভাব ছিল সর্বত্র। অনেক জমিদার ছিলেন দানবীর, মন্দির, বিদ্যালয়, সড়ক বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানে অনুদান দিয়ে তারা স্থায়ী খ্যাতি অর্জন করতেন। স্বাধীনতার পরে জমিদারি রদের সঙ্গে সঙ্গে এই উপাধির সমস্ত আইনগত ক্ষমতা কাগজে-কলমে শেষ হয়ে যায়, কিন্তু সামাজিক স্মৃতিতে তারা রয়ে গেছেন লোককথা ও সাহিত্যের চরিত্র হয়ে।

তালুকদার: জমিদারের অধীনে আবার ছোট ছোট প্রশাসনিক খণ্ডের দায়িত্ব থাকত তালুকদারদের হাতে। এক অর্থে তারা ছিলেন জমিদারের প্রতিনিধি। গ্রামীণ জনগণের উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব খাটানো এবং ভাড়া আদায়ের কাজে তালুকদারদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দেওয়ান: জমিদার বা প্রাদেশিক শাসকের পক্ষে রাজস্ব আদায় ও খাজনা ব্যবস্থার প্রধান কর্তা ছিলেন দেওয়ান। শুধু অর্থনীতি নয়, প্রশাসনিক কাজেও তাদের দক্ষতা দরকার হতো। অনেক সময় তারা জমিদার পরিবারের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠতেন।


চৌধুরী, মজুমদার, সিকদার, সরকার: এগুলি আসলে দায়িত্বভিত্তিক খেতাব।


চৌধুরী মানে চতুর্দিকের কর সংগ্রাহক,

মজুমদার হিসাবরক্ষক,

সিকদার এক-ষষ্ঠাংশ খাজনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা,

• আর সরকার ছিলেন পুরো অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক।

আজ এ সব নাম কেবল পদবী হিসেবে প্রচলিত, কিন্তু একসময় এগুলি ছিল ক্ষমতার প্রতীক।



ভূমি ও রাজস্বকেন্দ্রিক এই উপাধিগুলি বাংলার গ্রামীণ জীবনে এক বিশেষ সামাজিক শ্রেণি তৈরি করেছিল। গ্রামবাসীর সুখ-দুঃখ, উত্থান-পতন, এমনকি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও এই শ্রেণির সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করত। স্বাধীনতার পর জমিদারি প্রথা বিলোপের ফলে সেই ক্ষমতা হারিয়ে গেছে, তবে ইতিহাসের পাতায় তারা এখনও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।



©®তাপস কুমার পাল 

ঔপনিবেশিক শাসনের খেতাব



ভারতে ব্রিটিশ শাসন শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক কাঠামোকেও নতুন রূপ দিয়েছিল। সমাজে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে এবং তাদের সহযোগিতা নিশ্চিত করতে ব্রিটিশ সরকার বিভিন্ন উপাধি প্রদান করত। এই খেতাবগুলি একদিকে সম্মানের প্রতীক ছিল, অন্যদিকে তা ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতি অনুগত থাকার নিদর্শন।

রায় বাহাদুর: এটি ছিল সর্বোচ্চ মর্যাদার একটি খেতাব। সমাজসেবা, প্রশাসনিক দক্ষতা বা ব্রিটিশ শাসনের প্রতি বিশেষ আনুগত্যের জন্য এই উপাধি প্রদান করা হতো। যিনি এই খেতাব পেতেন, তিনি স্থানীয় সমাজে অদ্বিতীয় সম্মান অর্জন করতেন।

রায় সাহেব: রায় বাহাদুরের এক ধাপ নিচের সম্মান। প্রভাবশালী জমিদার, দানবীর বা প্রশাসনিক সহায়ক ব্যক্তিদের এ উপাধি দেওয়া হতো।

খান বাহাদুর: মুসলিম সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই খেতাব প্রদান করা হতো।

খান সাহেব: খান বাহাদুরের তুলনায় নিম্নতর হলেও স্থানীয় সমাজে এটি ছিল এক মর্যাদার প্রতীক।

কাইসার-ই-হিন্দ বা কাইজার - ই- হিন্দ : সমাজসেবা, চিকিৎসা বা শিক্ষাক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য দেওয়া হতো। বিশেষত চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদরা এ খেতাবের স্বীকৃতি পেতেন।

OBE (Order of the British Empire), MBE (Member of the British Empire): ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিশেষ সম্মাননা, যা ভারতীয় অভিজাত ও প্রশাসনিক সহযোগীদের হাতে তুলে দেওয়া হতো।


এই খেতাবধারীরা স্থানীয় সমাজে প্রায় রাজকীয় মর্যাদা পেতেন। তাদের নামের সঙ্গে যুক্ত হতো এক বিশেষ পরিচয়, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। কিন্তু স্বাধীনতার পর ভারতের সরকার সমস্ত ব্রিটিশ খেতাব আইনত বিলুপ্ত ঘোষণা করে। ফলে আজ এইসব উপাধি শুধু পারিবারিক স্মৃতি বা ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে টিকে আছে।


ঔপনিবেশিক শাসনের এই উপাধিগুলি একদিকে সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক হলেও, অন্যদিকে সেগুলি ছিল ব্রিটিশ শাসনের আনুগত্যের পুরস্কার। তাই স্বাধীনতার পর সেগুলি প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা হারালেও ইতিহাসে তারা হয়ে রইল ঔপনিবেশিক প্রভাবের নিদর্শন।

©®তাপস কুমার পাল 

নবাব ও জাগিরদার : মুসলিম শাসনের অবদান

বাংলার ইতিহাসে মুসলিম শাসনকাল এক বিশেষ অধ্যায়। এই সময়ে কেবল প্রশাসন ও অর্থনীতি নয়, সংস্কৃতি, স্থাপত্য এবং সমাজজীবনেও আমূল পরিবর্তন এসেছিল। সেই পরিবর্তনের প্রতীক ছিল কিছু খেতাব, যা একসময় প্রভাব, ক্ষমতা এবং মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

• নাওয়াব/নবাব: বাংলার মুসলিম শাসনকালে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ উপাধি ছিল ‘নাওয়াব’। নবাব মানে কেবল শাসক নয়, সমাজের অভিজাত শ্রেণির এক অনন্য প্রতীক। মুর্শিদাবাদের নবাব পরিবার এখনও ইতিহাসের অংশ হয়ে টিকে আছে। তাদের রাজপ্রাসাদ, দরবারি আচার-অনুষ্ঠান, শিল্প ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা আজও ঐতিহ্যের স্মারক।

জাগিরদার: জাগির ব্যবস্থা ছিল শাসকের পক্ষ থেকে বেতনস্বরূপ জমি দেওয়ার প্রথা। যিনি সেই জমির অধিকারী হতেন, তাকে বলা হতো ‘জাগিরদার’। তারা জমির খাজনা আদায় করে প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত থাকতেন এবং স্থানীয় সমাজে বিশাল প্রভাব খাটাতেন।

মুৎওয়াল্লি: মুসলিম ধর্মীয় সম্পত্তি, অর্থাৎ ওয়াক্‌ফ সম্পত্তির দেখভাল এবং পরিচালনার দায়িত্ব থাকত মুৎওয়াল্লিদের হাতে। তারা সমাজের ধর্মীয় কার্যক্রমে প্রভাবশালী ভূমিকায় থাকতেন।

মির্জা, সৈয়দ, বেগ : এ সব উপাধি ছিল বংশগত ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক। কারও আদি পরিচয় ও পারিবারিক গৌরব চিহ্নিত করত এইসব খেতাব। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলি পদবী হিসেবে থেকে গেলেও তাদের প্রাচীন গৌরবের অর্থ অনেকটাই হারিয়ে গেছে।



নবাব, জাগিরদার ও অন্যান্য অভিজাতদের উপাধি শুধু রাজনৈতিক শক্তি নয়, সাংস্কৃতিক জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় সংগীত, নৃত্য, সাহিত্য ও স্থাপত্য সমৃদ্ধ হয়েছিল। আজ সেই খেতাব আর ক্ষমতার প্রতীক নয়, কিন্তু তাদের ঐতিহাসিক অবদান এখনো বাংলার সংস্কৃতিতে জীবন্ত।



মুসলিম শাসনের দেওয়া এইসব উপাধি একসময় সমাজে শাসন, অভিজাত্য এবং সংস্কৃতির মিলিত প্রতীক ছিল। আজ তারা কেবল ঐতিহাসিক দলিল ও পদবীতে সীমাবদ্ধ হলেও, বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে।

©®
তাপস কুমার পাল 



শাস্ত্রীয় বিদ্যোপাধি : জ্ঞানের গৌরব

বাংলা তথা ভারতের প্রাচীন সমাজে জ্ঞানকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হতো। সমাজে যিনি শিক্ষিত, যিনি শাস্ত্রে পারদর্শী, তার সম্মান ছিল অদ্বিতীয়। সেই সম্মান প্রকাশ পেত বিশেষ কিছু বিদ্যোপাধির মাধ্যমে। এগুলি শুধু শিক্ষাগত স্বীকৃতি নয়, ছিল সামাজিক গৌরব ও মর্যাদার প্রতীক।

বিদ্যাসাগর, বিদ্যাবাগীশ: সংস্কৃত ব্যাকরণ, সাহিত্য ও দর্শনে যাঁরা অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করতেন, তাঁদের দেওয়া হতো এই খেতাব। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এই সম্মানজনক উপাধিকে আজও অমর করে রেখেছেন।

তর্করত্ন, তর্কভূষণ, তর্কালঙ্কার: ন্যায়শাস্ত্র ও তর্কবিদ্যায় পারদর্শী পণ্ডিতেরা এ ধরনের বিদ্যোপাধি অর্জন করতেন। এই খেতাব প্রাপ্তির মাধ্যমে তাঁরা শুধু আখড়ায় নয়, রাজসভাতেও বিশেষ সম্মান পেতেন।

কবিভূষণ, কবিরত্ন, কবিকঙ্কণ: কাব্যচর্চায় অনন্য কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ এই খেতাব দেওয়া হতো। যেমন—‘কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী’ তাঁর কাব্যের জন্য খ্যাত হন।

কাব্যতীর্থ, ব্যাকরণাচার্য: নির্দিষ্ট শাস্ত্রে অগাধ দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ দেওয়া হতো। আচার্য শব্দটি একসময় সমাজে গুরু ও পণ্ডিতের সর্বোচ্চ মর্যাদার প্রতীক ছিল।


এই বিদ্যোপাধিগুলি শুধু নামমাত্র নয়, সামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করত। যাঁরা এ খেতাব পেতেন, তাঁরা রাজসভায় সম্মানের আসনে বসতেন, গুরু হিসেবে শিষ্যদের শিক্ষা দিতেন এবং সমাজে ন্যায়-নীতির রক্ষক হিসেবে বিবেচিত হতেন।


বর্তমানে এইসব বিদ্যোপাধির জায়গা নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, একাডেমিক পুরস্কার এবং সরকারি সম্মাননা। তবে একসময় এই বিদ্যোপাধিগুলি যে বাঙালি সমাজকে জ্ঞাননির্ভর ও সংস্কৃতিনির্ভর করে তুলেছিল, তা ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে গেছে।


শাস্ত্রীয় বিদ্যোপাধিগুলি প্রমাণ করে, বাঙালি সমাজে জ্ঞানের মর্যাদা কেমন ছিল। বিদ্যাসাগর, তর্করত্ন বা কবিভূষণরা আজ আমাদের কাছে শুধু নাম নয়, তারা আমাদের ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ।



©®তাপস কুমার পাল 

ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক উপাধি

বাংলার সমাজজীবনে ধর্মীয় নেতাদের প্রভাব ছিল গভীর। তাঁরা শুধু আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক নন, সমাজের সাংস্কৃতিক ও নৈতিক দিশারীও ছিলেন। তাঁদের মর্যাদা প্রকাশ পেত বিশেষ কিছু ধর্মীয় উপাধির মাধ্যমে। এই উপাধিগুলি ছিল আস্থা, শ্রদ্ধা এবং ভক্তির প্রতীক।

গোঁসাই, মহারাজ: বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের গুরু ও আচার্যদের দেওয়া হতো এই উপাধি। গ্রামের গৃহস্থ থেকে শুরু করে রাজসভা পর্যন্ত তাঁদের ছিল অসীম প্রভাব।

পরমহংস, শ্রীশ্রী: সন্ন্যাসী ও আধ্যাত্মিক নেতাদের প্রতি প্রদত্ত সম্মানসূচক উপাধি। সমাজ তাঁদেরকে দীক্ষাগুরু, জ্ঞানগুরু এবং আধ্যাত্মিক আলোকবর্তিকা হিসেবে গ্রহণ করত।

আচার্য, স্বামীজি, মহাত্মা: হিন্দু ধর্মীয় আচার্য ও যোগগুরুদের জন্য ব্যবহৃত। অনেক সময় তাঁদের দর্শন ও শিক্ষা সমাজে নতুন আন্দোলনের জন্ম দিত।

মুত্তাওয়াল্লি: মুসলিম সমাজে ওয়াক্‌ফ সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক ও ধর্মীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দেওয়া সম্মানসূচক খেতাব।


এইসব উপাধিধারীরা শুধু ধর্মগুরু ছিলেন না, সমাজের নৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার মূল ভরসা ছিলেন। তাঁদের কথার মূল্য ছিল আইনসম, তাঁদের নির্দেশে সমাজের নিয়মকানুন পাল্টে যেত। উৎসব, মন্দির-মসজিদ, আশ্রম—সব ক্ষেত্রেই তাঁদের নেতৃত্ব ছিল অপরিহার্য।


আজও ‘মহারাজ’, ‘গোঁসাই’ বা ‘শ্রীশ্রী’ শব্দগুলি ব্যবহার হয়, কিন্তু সেগুলির সামাজিক ক্ষমতা আগের মতো নেই। আধুনিক রাষ্ট্র ও শিক্ষা-ব্যবস্থা সমাজকে নতুন কাঠামো দিয়েছে, ফলে এই উপাধিগুলি এখন মূলত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা ভক্তিমূলক পরিসরে সীমিত।


ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক উপাধি একসময় ছিল মানুষের শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু। এগুলি প্রমাণ করে, বাংলার সমাজে ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার গুরুত্ব কতখানি ছিল। আজ সেগুলি গৌরবময় ঐতিহ্য হয়ে রয়ে গেছে, কিন্তু তাদের সামাজিক শক্তি ইতিহাসে হারিয়ে গেছে।

©®তাপস কুমার পাল 

দরবারি ও সাংস্কৃতিক উপাধি

বাংলার ইতিহাসে রাজসভা শুধু শাসনের কেন্দ্র ছিল না, ছিল শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিরও আসর। রাজা ও নবাবরা কবি, গায়ক, নর্তকী, নাট্যকারদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তাঁদের প্রতিভার স্বীকৃতি দেওয়া হতো বিশেষ দরবারি উপাধির মাধ্যমে। এসব উপাধি শিল্পীদের গৌরব বাড়াত এবং তাঁদের সামাজিক মর্যাদা সুদৃঢ় করত।

রাজকবি: রাজদরবারের কবিদের দেওয়া হতো এই খেতাব। রাজকবি শুধু কাব্য রচনা করতেন না, দরবারের ইতিহাস, রাজস্তুতি ও সমকালীন সমাজচিত্রও ফুটিয়ে তুলতেন।

রাজারত্ন: সংগীত, নৃত্য বা সাহিত্যক্ষেত্রে অসামান্য কৃতিত্ব দেখালে রাজা এই খেতাব দিতেন। এটি ছিল রাজসভার বিশেষ সম্মান।

কবিভূষণ, কবিকঙ্কণ, কবিরত্ন: কাব্যচর্চা ও সাহিত্যকীর্তির জন্য প্রদত্ত নানা উপাধি। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী যেমন ‘কবিকঙ্কণ’ নামে খ্যাত।

সঙ্গীতরত্ন, নৃত্যাচার্য: সংগীত ও নৃত্যের গুরুদের দরবার থেকে প্রদত্ত সম্মানসূচক উপাধি। এসব খেতাব তাঁদের শিল্পীজীবনের পরিচয়পত্র হয়ে উঠত।


এইসব উপাধি শিল্পী ও কবিদের সমাজে বিশেষ মর্যাদা এনে দিত। তাঁদের প্রতিভা শুধু রাজসভাতেই নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও স্বীকৃতি পেত। ফলে সংগীত, সাহিত্য, নাটক ও নৃত্য বাংলার সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছিল।


বর্তমানে এ ধরনের উপাধির পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, একাডেমি সম্মান বা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধি দেওয়া হয়। তবে ইতিহাসে রাজসভা ও দরবারি সংস্কৃতি যে উপাধিগুলিকে বিশেষ গৌরব দিয়েছিল, সেগুলি আজও আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।


দরবারি ও সাংস্কৃতিক উপাধি প্রমাণ করে, বাঙালি সমাজে শিল্প-সাহিত্যের মর্যাদা কতখানি ছিল। রাজসভায় প্রাপ্ত এক খেতাব শিল্পীর জীবন পাল্টে দিত, তাঁর নাম ইতিহাসে স্থায়ীভাবে খোদাই করে দিত।



পরিশেষে এটুকুই বলা যায়, বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির ইতিহাসে নানা উপাধি ছিল কালের আয়না। জমিদার থেকে তালুকদার, দেওয়ান থেকে চৌধুরী— ভূমি ও রাজস্ব ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে উপাধির ছিল বিশেষ ভূমিকা। আবার রাজসভায় কবি, শিল্পী, সংগীতজ্ঞ ও নর্তকীরা উপাধির মাধ্যমে পেয়েছিলেন মর্যাদা ও স্বীকৃতি। এসব খেতাব শুধু ব্যক্তিগত গৌরবের প্রতীক ছিল না, ছিল সামাজিক অবস্থানের দলিল।

কিন্তু সময়ের স্রোতে যখন জমিদারি প্রথা উঠে গেল, ঔপনিবেশিক শাসন শেষ হলো, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন এইসব উপাধি ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল। আজ হয়তো এগুলি পদবী আকারে টিকে আছে, কিংবা গবেষণার উপাদান হয়ে আছে।

তবুও এই হারিয়ে যাওয়া উপাধিগুলি আমাদের ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ। এগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে একেকটি শব্দ একসময় ছিল ক্ষমতার প্রতীক, আবার কীভাবে সমাজের রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গেই তা শুধু ইতিহাস হয়ে গেল। তাই আজকের দিনে এগুলি নিয়ে আলোচনা করা মানে কেবল অতীত স্মরণ নয়, বরং সামাজিক পরিবর্তনের ইতিহাসকে নতুনভাবে বোঝা।

©®তাপস কুমার পাল 



Comments

Vvvy said…
খুব সুন্দর

Popular posts from this blog

একক বাদনের সুরে স্মরণে পণ্ডিত ভি. জি. যোগ

বৌদ্ধ মূর্তিতে কোঁকড়ানো চুলের রহস্য

টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার — কবিতা ও সঙ্গীত