সঙ্গীতের প্রেক্ষাপটে : নিওইজম
সঙ্গীতের প্রেক্ষাপটে : নিওইজম
©® প্রতিবেদনে - তাপস কুমার পাল।
“Music is not only harmony, it is also disruption, play and protest.”
— Neoist Manifesto
বিশ্বের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বহু আন্দোলন এসেছে—মডার্নিজম, দাদাইজম, স্যুররিয়ালিজম কিংবা পোস্টমডার্নিজম। প্রতিটি আন্দোলনের উদ্দেশ্যই ছিল নতুন ধারা সৃষ্টি ও প্রতিষ্ঠা। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে সূচনা হয় এক ভিন্নধর্মী প্রবাহের—নব্যবাদ বা নিওইজম (Neoism) এর সৃষ্টি । এটি কোনো রাজনৈতিক মতবাদ নয়, আবার কোনো সংগঠিত শিল্পধারাও নয়। বরং নিওইজম ছিল এমন এক অস্পষ্ট, বহুমুখী এবং ইচ্ছাকৃত বিশৃঙ্খল আন্দোলন, যেখানে পরিচয়, শিল্প ও রাজনীতিকে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল খেলা, প্র্যাঙ্ক ও বিদ্রূপের মাধ্যমে। প্রথমেই বলে রাখা দরকার, নিওইজম (Neoism) এর সঠিক বাংলা এখনো অধরা। অনুমান করা হয়ে এই শব্দের বাংলা "নব্যবাদ"।
চিত্রকলা, সাহিত্য ও পারফরম্যান্স আর্টের পাশাপাশি এর গভীর প্রভাব পড়েছিল সঙ্গীতেও। নিওইজম সঙ্গীতকে কেবল ধ্বনি বা সুরের সমষ্টি হিসেবে দেখেনি; বরং একে গ্রহণ করেছিল খেলা, বিদ্রূপ এবং পরিচয়ের ভাঙাগড়ার একটি ক্ষেত্র হিসেবে।
নিওইজম কী?
"নিওইজম" মূলত ১৯৮০-এর দশকে কানাডায় জন্ম নেয় এবং দ্রুতই ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। এর সূচনা ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন মেল-আর্টিস্ট ডেভিড জ্যাকবসন (David Zack) এবং হাঙ্গেরীয়-কানাডীয় শিল্পী ইস্তভান কান্তর (Istvan Kantor)। তাঁদের হাত ধরে নিওইজম হয়ে ওঠে এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরীক্ষাগার, যেখানে শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত এবং সামাজিক জীবন মিলেমিশে যায় এক বিশৃঙ্খল অথচ সৃজনশীল প্রবাহে।
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
• সমষ্টিগত নাম ব্যবহার
নিওইজমের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো সমষ্টিগত পরিচয়ের ধারণা। অংশগ্রহণকারীরা প্রায়শই নিজেদের প্রকৃত নাম ব্যবহার করতেন না। বরং সবাই মিলে একটি যৌথ নাম নিতেন, যেমন—“Monty Cantsin” বা পরবর্তীতে “Karen Eliot”। এই নাম যে কেউ ব্যবহার করতে পারতো। এর ফলে ব্যক্তিগত খ্যাতি বা পরিচয়ের বদলে গড়ে উঠতো সমষ্টিগত চেতনা।
• শিল্প ও জীবনের মিশ্রণ
নিওইজম কেবল চিত্রকলা বা সাহিত্য নয়, বরং পারফরম্যান্স আর্ট, কোলাজ, কবিতা, সংগীত, চিঠিপত্র (mail art), গ্রাফিতি—সবকিছুকেই নিজেদের ক্যানভাস বানিয়েছিল। ফলে দৈনন্দিন জীবন ও শিল্পের সীমানা মুছে গিয়ে তৈরি হয়েছিল এক নতুন বাস্তবতা।
• বিদ্রূপ ও প্র্যাঙ্ক
নিওইজমে কৌতুক ও বিদ্রূপ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক রীতি-নীতি কিংবা শিল্পের প্রচলিত ধ্যানধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতো প্র্যাঙ্ক বা মজার ছলে প্রতিবাদের মাধ্যমে। এই প্র্যাঙ্ক কখনো শ্রোতা বা দর্শককে হাসাতো, কখনো বিভ্রান্ত করতো, আবার কখনো তীব্রভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করতো।
• ইচ্ছাকৃত অস্পষ্টতা
নিওইজম সচেতনভাবেই কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিল। কারণ তাদের মতে, একবার কোনো আন্দোলন স্পষ্ট সংজ্ঞায় বাঁধা পড়লে সেটি গৎবাঁধা হয়ে যায়। তাই নিওইজমের ব্যাখ্যা যতবার দেওয়া হয়েছে, ততবারই তা ভেঙে গিয়েছে নতুন দিক দিয়ে।
সংক্ষেপে, নিওইজম এমন এক সাংস্কৃতিক প্রবাহ যা নিজেকে কখনোই সীমাবদ্ধ হতে দেয়নি। এটি একদিকে যেমন পরিচয়বিরোধী, অন্যদিকে তেমনি সীমা ভাঙার খেলা। আর এই দিকটাই একে আলাদা করেছে অন্যান্য শিল্প-আন্দোলনের থেকে।
নিওইজমের দার্শনিক দিক
"নিওইজম" কেবল একটি সাংস্কৃতিক প্রবাহই নয়, এর ভেতরে রয়েছে গভীর দর্শন। এই দর্শন শিল্প, সমাজ ও মানবজীবনের মৌলিক ধারণাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
মূল দৃষ্টিভঙ্গি
• “শিল্প মানে খেলা”
নিওইজমের মতে, শিল্প মানেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা। প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে যে কোনো ধরণের প্ররোচনা, বিদ্রূপ বা অপ্রত্যাশিত খেলা শিল্প হয়ে উঠতে পারে। শিল্পকে তাই এখানে দেখা হয় গুরুগম্ভীর সৃষ্টির ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং এক অন্তহীন খেলার মাঠ হিসেবে।
• “পরিচয় একটি কনস্ট্রাক্ট”
নিওইজম মনে করে ব্যক্তিগত নাম, খ্যাতি বা স্বাতন্ত্র্য—এসবই আসলে সমাজ তৈরি করে দিয়েছে। এগুলো প্রাকৃতিক সত্য নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক নির্মাণ (social construct)। তাই এগুলো ভেঙে ফেলা যায়, বদলানো যায়। যৌথ নাম ব্যবহার করে তারা দেখিয়েছে—ব্যক্তি নয়, বরং সমষ্টিগত পরিচয়ই আসল শক্তি।
• “অস্পষ্টতাই মুক্তি”
নিওইজম কোনো চূড়ান্ত সত্য বা অর্থকে মানতে চায়নি। তাদের বিশ্বাস—যেখানে সবকিছু স্পষ্ট, সেখানে মানুষ বাঁধা পড়ে যায়। বরং অস্পষ্টতা, দ্ব্যর্থতা এবং বিশৃঙ্খলার ভেতরেই মানুষ খুঁজে পায় প্রকৃত স্বাধীনতা।
অর্থাৎ, নিওইজমের দর্শন আমাদের শেখায়—
• শিল্পের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই,
• পরিচয় কখনোই স্থায়ী নয়,
• আর অনিশ্চয়তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে মুক্তির সম্ভাবনা।
সঙ্গীতে নব্যবাদ বা নিওইজমের প্রভাব
নিওইজমের দর্শন অনুযায়ী—
• সঙ্গীত মানেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা:
প্রচলিত রাগ, তাল বা পশ্চিমা হারমোনির বাইরে গিয়ে তারা ভাঙাগড়া করেছে ধ্বনিকে।
• “ওপেন পপ স্টার” ধারণা:
যেমন সবাই “Monty Cantsin” বা “Karen Eliot” নামে পরিচিত হতো, তেমনি সঙ্গীতে একাধিক শিল্পী একই পরিচয় ব্যবহার করে গান বা পরিবেশনা তৈরি করতেন। এর ফলে ব্যক্তিগত খ্যাতির পরিবর্তে সমষ্টিগত সৃজনশীলতাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
• ধ্বনির বিশৃঙ্খলা:
নিওইজমের সঙ্গীতে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বাভাবিক সাউন্ড, ভাঙা সুর, অসামঞ্জস্যপূর্ণ রিদম ব্যবহার হতো। এগুলো সমাজ-সংস্কৃতির শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে বিদ্রূপ হিসেবেই দেখা যেত।
• প্র্যাঙ্ক ও পারফরম্যান্স:
অনেক সময় সঙ্গীত পরিবেশনা ছিল এক ধরনের প্র্যাঙ্ক—যেমন হঠাৎ অকারণে শব্দ থেমে যাওয়া, শ্রোতাদের উপর শব্দ নিক্ষেপ করা, বা পরিচিত গানের সুর বিকৃত করে পরিবেশন করা।
নিওইজম ও পরীক্ষামূলক সঙ্গীত
নিওইজমকে অনেকেই তুলনা করেন অ্যাভাঁ-গার্ড (avant-garde) মিউজিক বা নয়েজ মিউজিক ধারার সঙ্গে।
• যেমন—John Cage-এর 4’33’’ (যেখানে পুরোটা সময় কোনো বাজনা নেই, শুধু পরিবেশের শব্দই সঙ্গীত), তা নিওইজমের দর্শনের সঙ্গে মিলে যায়।
• Fluxus আন্দোলনের সঙ্গীত পরীক্ষার মতোই নিওইজমও চেয়েছিল সঙ্গীতকে সীমাহীন করে তুলতে।
বাংলার প্রেক্ষাপটে নিওইজম ও সঙ্গীত
বাংলায় সরাসরি নব্যবাদ বা নিওইজম আন্দোলন না এলেও, কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়—
• বাউল দর্শন:
বাউলরা মনে করেন—“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবে।” এখানে ব্যক্তি নয়, সমষ্টিগত চেতনা মুখ্য। নিওইজমের যৌথ পরিচয়ের ভাবনার সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক আছে।
• লোকসঙ্গীতে তাৎক্ষণিকতা:
অনেক সময় লোকগানের সুর ও বোল পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। এ এক ধরনের পরীক্ষামূলক ধারা, যা নব্যবাদ বা নিওইজমের ভাবনার কাছাকাছি।
• আধুনিক পরীক্ষামূলক সঙ্গীত:
কলকাতার কিছু ব্যান্ড, ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পীর ইলেকট্রনিক সাউন্ডের সঙ্গে মিশ্রণ, অথবা জ্যাজ-ইন্ডিয়ান ফিউশন—এসবও নব্যবাদ বা নিওইজমের দৃষ্টিতে পড়তে পারে।
উপসংহারে বলা যায় -
নিওইজমের সঙ্গীত আমাদের শেখায়—
• সঙ্গীত কেবল সুরেলা অভিজ্ঞতা নয়, বরং প্রশ্ন তোলা, পরিচয় ভাঙা ও খেলার মাধ্যমে নতুন অর্থ সৃষ্টির পথ।
• ধ্বনির বিশৃঙ্খলাও এক ধরনের শিল্প, যা প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করে।
• সমষ্টিগত নাম ও যৌথ পরিচয়ের আড়ালে সঙ্গীত রূপ নেয় সমাজবিরোধী প্রতিবাদ ও সাংস্কৃতিক বিদ্রূপের এক অনন্য হাতিয়ারে।
নিওইজম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবনও একধরনের খেলা, যেখানে স্থির কোনো সত্য নেই, নেই চূড়ান্ত পরিচয়। শিল্প, সৃজনশীলতা এবং মানব-অস্তিত্ব—সবই এক চলমান প্রক্রিয়া। আর সেই প্রক্রিয়ার ভেতরেই নিহিত রয়েছে আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতা।
রেফারেন্স
• Zack, David. Correspondence and Mail Art Archives.
• Kantor, Istvan. Neoism, Plagiarism and Praxis. 1989.
• Home, Stewart. The Assault on Culture: Utopian Currents from Lettrisme to Class War. 1988.
• Perneczky, Géza. The Magazine Network: The Trends of Alternative Art in the Light of Their Periodicals, 1968–1988.
✍️ লেখক: তাপস কুমার পাল
©® প্রতিবেদনে - তাপস কুমার পাল।
“Music is not only harmony, it is also disruption, play and protest.”
— Neoist Manifesto
বিশ্বের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে বহু আন্দোলন এসেছে—মডার্নিজম, দাদাইজম, স্যুররিয়ালিজম কিংবা পোস্টমডার্নিজম। প্রতিটি আন্দোলনের উদ্দেশ্যই ছিল নতুন ধারা সৃষ্টি ও প্রতিষ্ঠা। কিন্তু ১৯৮০-এর দশকে উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে সূচনা হয় এক ভিন্নধর্মী প্রবাহের—নব্যবাদ বা নিওইজম (Neoism) এর সৃষ্টি । এটি কোনো রাজনৈতিক মতবাদ নয়, আবার কোনো সংগঠিত শিল্পধারাও নয়। বরং নিওইজম ছিল এমন এক অস্পষ্ট, বহুমুখী এবং ইচ্ছাকৃত বিশৃঙ্খল আন্দোলন, যেখানে পরিচয়, শিল্প ও রাজনীতিকে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল খেলা, প্র্যাঙ্ক ও বিদ্রূপের মাধ্যমে। প্রথমেই বলে রাখা দরকার, নিওইজম (Neoism) এর সঠিক বাংলা এখনো অধরা। অনুমান করা হয়ে এই শব্দের বাংলা "নব্যবাদ"।
চিত্রকলা, সাহিত্য ও পারফরম্যান্স আর্টের পাশাপাশি এর গভীর প্রভাব পড়েছিল সঙ্গীতেও। নিওইজম সঙ্গীতকে কেবল ধ্বনি বা সুরের সমষ্টি হিসেবে দেখেনি; বরং একে গ্রহণ করেছিল খেলা, বিদ্রূপ এবং পরিচয়ের ভাঙাগড়ার একটি ক্ষেত্র হিসেবে।
নিওইজম কী?
"নিওইজম" মূলত ১৯৮০-এর দশকে কানাডায় জন্ম নেয় এবং দ্রুতই ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে। এর সূচনা ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন মেল-আর্টিস্ট ডেভিড জ্যাকবসন (David Zack) এবং হাঙ্গেরীয়-কানাডীয় শিল্পী ইস্তভান কান্তর (Istvan Kantor)। তাঁদের হাত ধরে নিওইজম হয়ে ওঠে এক বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পরীক্ষাগার, যেখানে শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত এবং সামাজিক জীবন মিলেমিশে যায় এক বিশৃঙ্খল অথচ সৃজনশীল প্রবাহে।
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
• সমষ্টিগত নাম ব্যবহার
নিওইজমের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো সমষ্টিগত পরিচয়ের ধারণা। অংশগ্রহণকারীরা প্রায়শই নিজেদের প্রকৃত নাম ব্যবহার করতেন না। বরং সবাই মিলে একটি যৌথ নাম নিতেন, যেমন—“Monty Cantsin” বা পরবর্তীতে “Karen Eliot”। এই নাম যে কেউ ব্যবহার করতে পারতো। এর ফলে ব্যক্তিগত খ্যাতি বা পরিচয়ের বদলে গড়ে উঠতো সমষ্টিগত চেতনা।
• শিল্প ও জীবনের মিশ্রণ
নিওইজম কেবল চিত্রকলা বা সাহিত্য নয়, বরং পারফরম্যান্স আর্ট, কোলাজ, কবিতা, সংগীত, চিঠিপত্র (mail art), গ্রাফিতি—সবকিছুকেই নিজেদের ক্যানভাস বানিয়েছিল। ফলে দৈনন্দিন জীবন ও শিল্পের সীমানা মুছে গিয়ে তৈরি হয়েছিল এক নতুন বাস্তবতা।
• বিদ্রূপ ও প্র্যাঙ্ক
নিওইজমে কৌতুক ও বিদ্রূপ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক রীতি-নীতি কিংবা শিল্পের প্রচলিত ধ্যানধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতো প্র্যাঙ্ক বা মজার ছলে প্রতিবাদের মাধ্যমে। এই প্র্যাঙ্ক কখনো শ্রোতা বা দর্শককে হাসাতো, কখনো বিভ্রান্ত করতো, আবার কখনো তীব্রভাবে চিন্তা করতে বাধ্য করতো।
• ইচ্ছাকৃত অস্পষ্টতা
নিওইজম সচেতনভাবেই কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিল। কারণ তাদের মতে, একবার কোনো আন্দোলন স্পষ্ট সংজ্ঞায় বাঁধা পড়লে সেটি গৎবাঁধা হয়ে যায়। তাই নিওইজমের ব্যাখ্যা যতবার দেওয়া হয়েছে, ততবারই তা ভেঙে গিয়েছে নতুন দিক দিয়ে।
সংক্ষেপে, নিওইজম এমন এক সাংস্কৃতিক প্রবাহ যা নিজেকে কখনোই সীমাবদ্ধ হতে দেয়নি। এটি একদিকে যেমন পরিচয়বিরোধী, অন্যদিকে তেমনি সীমা ভাঙার খেলা। আর এই দিকটাই একে আলাদা করেছে অন্যান্য শিল্প-আন্দোলনের থেকে।
নিওইজমের দার্শনিক দিক
"নিওইজম" কেবল একটি সাংস্কৃতিক প্রবাহই নয়, এর ভেতরে রয়েছে গভীর দর্শন। এই দর্শন শিল্প, সমাজ ও মানবজীবনের মৌলিক ধারণাগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
মূল দৃষ্টিভঙ্গি
• “শিল্প মানে খেলা”
নিওইজমের মতে, শিল্প মানেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা। প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে যে কোনো ধরণের প্ররোচনা, বিদ্রূপ বা অপ্রত্যাশিত খেলা শিল্প হয়ে উঠতে পারে। শিল্পকে তাই এখানে দেখা হয় গুরুগম্ভীর সৃষ্টির ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং এক অন্তহীন খেলার মাঠ হিসেবে।
• “পরিচয় একটি কনস্ট্রাক্ট”
নিওইজম মনে করে ব্যক্তিগত নাম, খ্যাতি বা স্বাতন্ত্র্য—এসবই আসলে সমাজ তৈরি করে দিয়েছে। এগুলো প্রাকৃতিক সত্য নয়, বরং এক ধরনের সামাজিক নির্মাণ (social construct)। তাই এগুলো ভেঙে ফেলা যায়, বদলানো যায়। যৌথ নাম ব্যবহার করে তারা দেখিয়েছে—ব্যক্তি নয়, বরং সমষ্টিগত পরিচয়ই আসল শক্তি।
• “অস্পষ্টতাই মুক্তি”
নিওইজম কোনো চূড়ান্ত সত্য বা অর্থকে মানতে চায়নি। তাদের বিশ্বাস—যেখানে সবকিছু স্পষ্ট, সেখানে মানুষ বাঁধা পড়ে যায়। বরং অস্পষ্টতা, দ্ব্যর্থতা এবং বিশৃঙ্খলার ভেতরেই মানুষ খুঁজে পায় প্রকৃত স্বাধীনতা।
অর্থাৎ, নিওইজমের দর্শন আমাদের শেখায়—
• শিল্পের কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই,
• পরিচয় কখনোই স্থায়ী নয়,
• আর অনিশ্চয়তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে মুক্তির সম্ভাবনা।
সঙ্গীতে নব্যবাদ বা নিওইজমের প্রভাব
নিওইজমের দর্শন অনুযায়ী—
• সঙ্গীত মানেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা:
প্রচলিত রাগ, তাল বা পশ্চিমা হারমোনির বাইরে গিয়ে তারা ভাঙাগড়া করেছে ধ্বনিকে।
• “ওপেন পপ স্টার” ধারণা:
যেমন সবাই “Monty Cantsin” বা “Karen Eliot” নামে পরিচিত হতো, তেমনি সঙ্গীতে একাধিক শিল্পী একই পরিচয় ব্যবহার করে গান বা পরিবেশনা তৈরি করতেন। এর ফলে ব্যক্তিগত খ্যাতির পরিবর্তে সমষ্টিগত সৃজনশীলতাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
• ধ্বনির বিশৃঙ্খলা:
নিওইজমের সঙ্গীতে ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বাভাবিক সাউন্ড, ভাঙা সুর, অসামঞ্জস্যপূর্ণ রিদম ব্যবহার হতো। এগুলো সমাজ-সংস্কৃতির শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে বিদ্রূপ হিসেবেই দেখা যেত।
• প্র্যাঙ্ক ও পারফরম্যান্স:
অনেক সময় সঙ্গীত পরিবেশনা ছিল এক ধরনের প্র্যাঙ্ক—যেমন হঠাৎ অকারণে শব্দ থেমে যাওয়া, শ্রোতাদের উপর শব্দ নিক্ষেপ করা, বা পরিচিত গানের সুর বিকৃত করে পরিবেশন করা।
নিওইজম ও পরীক্ষামূলক সঙ্গীত
নিওইজমকে অনেকেই তুলনা করেন অ্যাভাঁ-গার্ড (avant-garde) মিউজিক বা নয়েজ মিউজিক ধারার সঙ্গে।
• যেমন—John Cage-এর 4’33’’ (যেখানে পুরোটা সময় কোনো বাজনা নেই, শুধু পরিবেশের শব্দই সঙ্গীত), তা নিওইজমের দর্শনের সঙ্গে মিলে যায়।
• Fluxus আন্দোলনের সঙ্গীত পরীক্ষার মতোই নিওইজমও চেয়েছিল সঙ্গীতকে সীমাহীন করে তুলতে।
বাংলার প্রেক্ষাপটে নিওইজম ও সঙ্গীত
বাংলায় সরাসরি নব্যবাদ বা নিওইজম আন্দোলন না এলেও, কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়—
• বাউল দর্শন:
বাউলরা মনে করেন—“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবে।” এখানে ব্যক্তি নয়, সমষ্টিগত চেতনা মুখ্য। নিওইজমের যৌথ পরিচয়ের ভাবনার সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক আছে।
• লোকসঙ্গীতে তাৎক্ষণিকতা:
অনেক সময় লোকগানের সুর ও বোল পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। এ এক ধরনের পরীক্ষামূলক ধারা, যা নব্যবাদ বা নিওইজমের ভাবনার কাছাকাছি।
• আধুনিক পরীক্ষামূলক সঙ্গীত:
কলকাতার কিছু ব্যান্ড, ধ্রুপদী সঙ্গীতশিল্পীর ইলেকট্রনিক সাউন্ডের সঙ্গে মিশ্রণ, অথবা জ্যাজ-ইন্ডিয়ান ফিউশন—এসবও নব্যবাদ বা নিওইজমের দৃষ্টিতে পড়তে পারে।
উপসংহারে বলা যায় -
নিওইজমের সঙ্গীত আমাদের শেখায়—
• সঙ্গীত কেবল সুরেলা অভিজ্ঞতা নয়, বরং প্রশ্ন তোলা, পরিচয় ভাঙা ও খেলার মাধ্যমে নতুন অর্থ সৃষ্টির পথ।
• ধ্বনির বিশৃঙ্খলাও এক ধরনের শিল্প, যা প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করে।
• সমষ্টিগত নাম ও যৌথ পরিচয়ের আড়ালে সঙ্গীত রূপ নেয় সমাজবিরোধী প্রতিবাদ ও সাংস্কৃতিক বিদ্রূপের এক অনন্য হাতিয়ারে।
নিওইজম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবনও একধরনের খেলা, যেখানে স্থির কোনো সত্য নেই, নেই চূড়ান্ত পরিচয়। শিল্প, সৃজনশীলতা এবং মানব-অস্তিত্ব—সবই এক চলমান প্রক্রিয়া। আর সেই প্রক্রিয়ার ভেতরেই নিহিত রয়েছে আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতা।
রেফারেন্স
• Zack, David. Correspondence and Mail Art Archives.
• Kantor, Istvan. Neoism, Plagiarism and Praxis. 1989.
• Home, Stewart. The Assault on Culture: Utopian Currents from Lettrisme to Class War. 1988.
• Perneczky, Géza. The Magazine Network: The Trends of Alternative Art in the Light of Their Periodicals, 1968–1988.
✍️ লেখক: তাপস কুমার পাল
Comments