হাকা নৃত্য : নিউজিল্যান্ডের আত্মা ও ঐতিহ্যের প্রতীক

হাকা নৃত্য : নিউজিল্যান্ডের আত্মা ও ঐতিহ্যের প্রতীক

©®

প্রায় এক হাজার বছর আগে পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে নৌযানে ভেসে আসে একদল মানুষ। তারা এসে পৌঁছায় এক অজানা দ্বীপভূমিতে, যাকে তারা ভালোবেসে নাম দেয় ‘আওতেয়ারোয়া’ (Aotearoa) — অর্থাৎ “দীর্ঘ সাদা মেঘের দেশ”। এই ভূমিতেই তারা গড়ে তোলে নিজেদের সভ্যতা, ভাষা ও সংস্কৃতি — জন্ম নেয় "মাওরি জাতি"।

মাওরি জাতি হলো নিউজিল্যান্ড ভূখণ্ডের আদিবাসী একটি পলিনেশীয় জাতি। পলিনেশিয়া হল মধ্য ও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল, যেখানে অসংখ্য দ্বীপ এবং দ্বীপপুঞ্জ রয়েছে। আর পলিনেশীয় জাতি বলতে প্রশান্ত মহাসাগরের পলিনেশিয়ান ত্রিভুজ অঞ্চলের আদিবাসীদের বোঝানো হয়। এই মাওরিদের পূর্বপুরুষেরা প্রায় ১৩২০ থেকে ১৩৫০ সালের মধ্যে বিভিন্ন যাত্রায় নিউজিল্যান্ডে আসেন। বর্তমানে এই জনগোষ্ঠীই নিউজিল্যান্ডের আত্মার প্রতীক।

মাওরি জনগণের একটি নিজস্ব পলিনেশিয়ান ধর্ম রয়েছে যা নিউজিল্যান্ডে খ্রিস্টধর্ম প্রবর্তনের আগে মাওরিদের প্রধান ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল। ১৮৪৫ সালের মধ্যে, মাওরি জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি গির্জায় যোগদান করত এবং খ্রিস্টধর্ম মাওরিদের জন্য বৃহত্তম ধর্ম হিসেবে রয়ে গেছে। নিউজিল্যান্ডের হৃদয়ে আজও ধ্বনিত হয় এক প্রাচীন জাতির গান — ‘মাওরি’ (Māori) গান। যে গান প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও ঐক্যের অনন্য মেলবন্ধনে গড়া।
©®


মাওরিদের ভাষা ও সমাজজীবন


মাওরিদের ভাষা হল 'তে রিও মাওরি' (Te Reo Māori), যা নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী মাওরি জনগোষ্ঠীর ভাষা। এটি একটি পূর্ব পলিনেশিয়ান ভাষা এবং ১৯৮৭ সাল থেকে এটি নিউজিল্যান্ডের অন্যতম সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। এই ভাষার কিছু আঞ্চলিক উপভাষাও রয়েছে এবং ইউরোপীয়দের সংস্পর্শে আসার আগে এর কোনো লিখিত রূপ ছিল না, কিন্তু বর্তমানে এটি ল্যাটিন বর্ণমালা ব্যবহার করে লেখা হয়।


মাওরিদের সমাজ জীবন ছিল গোষ্ঠীভিত্তিক, যেখানে প্রধানরা (রাঙ্গাতিরা), সাধারণ মানুষ (টুটুয়া বা ওয়্যার) এবং দাসদের (তৌরেকারেক) মতো সামাজিক স্তর ছিল। তাদের জীবনযাত্রা মূলত ছিল কৃষিকাজ, মাছ ধরা এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে যৌথভাবে বিভিন্ন কাজ করার উপর নির্ভরশীল। এছাড়াও, গল্প বলা এবং পৌরাণিক কাহিনী তাদের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মৌখিকভাবে চলে আসছে। 
©®
সামাজিক কাঠামো ও স্তর
• রাঙ্গাতিরা (Rangatira): এটি ছিল প্রধানদের গোষ্ঠী, যারা সমাজে নেতৃত্ব দিত।
• টুটুয়া বা ওয়্যার (Tutua or Warea): এটি ছিল সাধারণ জনগণের গোষ্ঠী।
• তৌরেকারেক (Tourekae): এটি ছিল দাসদের গোষ্ঠী।
• তোহুঙ্গা (Tohunga): পুরোহিত এবং বিশেষজ্ঞদের কখনও কখনও একটি পৃথক গোষ্ঠী হিসেবে গণ্য করা হতো। 


এছাড়া তাদের সমাজ গোত্রভিত্তিক — ‘ইউই’ (Iwi) ও ‘হাপু’ (Hapū)। প্রতিটি গোষ্ঠীর ছিল নিজস্ব নিয়মনীতি ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস, যেখানে প্রকৃতি ও পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধাই ছিল জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।


©®
হাকা নৃত্য : ঐতিহ্যবাহী নৃত্য


‘হাকা’ (Haka),  নিউজিল্যান্ডের মাওরি সংস্কৃতির একটি ঐতিহ্যবাহী ও আনুষ্ঠানিক নৃত্য যা মূলত একটি দলবদ্ধ পরিবেশনা। এই নাচের মধ্যে ছন্দময় চিৎকার, জোরালো অঙ্গভঙ্গি এবং মাটিতে পা ঠোকার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে। ঐতিহ্যগতভাবে এটি যুদ্ধের আগে প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর জন্য এবং মনোবল বাড়ানোর জন্য পরিবেশন করা হতো, তবে বর্তমানে এটি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান যেমন অতিথিদের স্বাগত জানানো, বড় কোনো কৃতিত্বের উদযাপন বা শোকের সময়েও পরিবেশন করা হয়। প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, মাওরি শিল্পে কাঠ খোদাই, বয়ন ও ‘তা মকো’ (Ta Moko) নামে পরিচিত উল্কি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রতিটি নকশা একেকটি জীবনের গল্প, পরিচয় ও গর্বের প্রতীক।




©®
মাওরিদের সঙ্গীতচর্চা

মাওরিদের সঙ্গীত মূলত প্রকৃতিনির্ভর ও আধ্যাত্মিক। তাদের গানে থাকে প্রকৃতি, যুদ্ধ, ভালোবাসা ও পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশ। ঐতিহ্যবাহী মাওরি সঙ্গীতকে বলা হয় ‘Waiata’ (ওয়াইআটা)। এই ওয়াইআটা বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে – যেমন:
• Waiata aroha (প্রেমের গান)
• Waiata tangi (শোকগাথা)
• Waiata whaiaaipo (বিবাহসংক্রান্ত গান)।


সঙ্গীতে ব্যবহার করা হয় taonga pūoro, অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র যেমন – pūtōrino (বাঁশির মতো), kōauau, pūkāea (শিঙা জাতীয় বাদ্য) ইত্যাদি। এসব বাদ্যযন্ত্র মানুষের আত্মা ও প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর সম্পর্কের প্রতীক।



পরিশেষে এটুকুই বলা যায়, আজও মাওরি ঐতিহ্য নিউজিল্যান্ডের জাতীয় পরিচয়ের গর্বের অংশ। সরকারি অনুষ্ঠান শুরু হয় মাওরি স্বাগতধ্বনি দিয়ে, জাতীয় সংগীতে শোনা যায় তাদের ভাষা।
রাষ্ট্র আজ মাওরি ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় একনিষ্ঠভাবে কাজ করছে — কারণ মাওরি মানেই নিউজিল্যান্ডের আত্মার প্রতিধ্বনি। তাই মাওরি সংস্কৃতি শুধু ইতিহাস নয় — এটি জীবন্ত ঐতিহ্য, যা শেখায় মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক কত গভীর, কত পবিত্র হতে পারে।
নিউজিল্যান্ড আজও গর্বের সঙ্গে বলে —
“আমরা সবাই আওতেয়ারোয়ার সন্তান।”
©®
প্রতিবেদনে - তাপস কুমার পাল 

Comments

Anonymous said…
Valo laglo

Popular posts from this blog

একক বাদনের সুরে স্মরণে পণ্ডিত ভি. জি. যোগ

বৌদ্ধ মূর্তিতে কোঁকড়ানো চুলের রহস্য

টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার — কবিতা ও সঙ্গীত