পৃথিবীর একমাত্র সুরের গ্রাম
পৃথিবীর একমাত্র সুরের গ্রাম
©®- তাপস কুমার পাল
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মনোরম মেঘালয়ের পাহাড়ি কোলে, শিলং থেকে প্রায় ৫০-৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এক বিস্ময়কর গ্রাম — কংথং (Kongthong)। এই ছোট্ট গ্রামটি পৃথিবীর মানচিত্রে এক অনন্য পরিচয়ে পরিচিত — সুরের গ্রাম বা "সিটি বাজানোর গ্রাম" ("Whistling Village") নামে।
যে গ্রামে নাম নয়, সুরেই পরিচয়
মেঘালয়ের কংথং (Kongthong) গ্রামে প্রতিটি বাসিন্দার পরিচয় নির্ধারিত হয় তাদের নিজস্ব সুর বা হুইসল দ্বারা। এখানে কারও নাম ধরে ডাকা হয় না — বরং তার জন্য নির্দিষ্ট একটি সুর বাজানো হয়। এই বিশেষ সুরটি তৈরি করেন শিশুর মা, ভালোবাসা ও মমতার মিশেলে। মায়ের সৃষ্টি করা সেই সুরকেই বলা হয় “Jingrwai Iawbei”, যার অর্থ “মায়ের তৈরি গান”।
কংথংবাসীদের জন্য এই “জিংরোয়াই ইয়াওবেই” শুধু নাম নয়, বরং এক জীবন্ত সুরেলা নামকরণ প্রথা — যা একদিকে মায়ের ভালোবাসার প্রতীক, অন্যদিকে সঙ্গীতের মাধ্যমে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার এক অনন্য মাধ্যম। ঐতিহাসিকভাবে এই প্রথা শতাব্দী প্রাচীন এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের খাসি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই ঐতিহ্য সুরের মাধ্যমে উত্তরাধিকার হিসেবে বহমান। এছাড়া “জিংরোয়াই ইয়াওবেই” শুধু একটি ব্যক্তিগত পরিচয় নয়; এটি পরিবারের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের সুরেলা চিহ্ন। এই ঐতিহ্য গ্রামীণ সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক, ভালোবাসা এবং সামাজিক ঐক্যকে বহুগুণে জোরদার করে তোলে। শিশুর জন্মের পর মা নিজেই তার সন্তানের জন্য একটি বিশেষ সুর তৈরি করেন, যা সারাজীবন ধরে সেই সন্তানের পরিচয়ের প্রতীক হয়ে থাকে। গ্রামে কেউ যদি দূর থেকে কাউকে ডাকতে চান, তিনি শুধু সেই ব্যক্তির সুরটি বাজান — আর তাতেই জানা যায়, কাকে ডাকা হচ্ছে।
প্রথাগত সংস্কৃতির অনন্য ধারা
প্রায় ৭০০ জন বাসিন্দা-সম্পন্ন এই গ্রামটি মেঘালয়ের খাসি জনগোষ্ঠীর এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। এটি কেবল যোগাযোগের এক অভিনব পদ্ধতি নয়, বরং মানবসম্পর্কের সুরেলা ভাষা — যেখানে ভালোবাসা, আত্মপরিচয় ও সমাজবোধ একসাথে মিশে যায় সংগীতের ছন্দে।
বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি
এই অনন্য প্রথা ও সংস্কৃতির কারণে ইউনাইটেড নেশনস ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন (UNWTO) কংথং গ্রামকে দিয়েছে “সেরা পর্যটন গ্রাম” (World’s Best Tourism Village)-এর স্বীকৃতি। এটি শুধু ভারতের নয়, সমগ্র বিশ্বের এক সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
সুরের মাধ্যমে সম্পর্কের দুনিয়া
কংথং গ্রাম যেন এক জীবন্ত সঙ্গীতময় সমাজ — যেখানে প্রত্যেক মানুষ একটি সুর, প্রত্যেক সম্পর্ক একটি রাগিনী, আর প্রতিটি আহ্বান এক মধুর সিটি। এমন এক গ্রাম, যেখানে মানুষকে নাম নয়, সুরে চিনে নেওয়া যায়। এই "মেঘালয় রাজ্যের" নামকরণ করেন এক বাঙালি ভূবিজ্ঞানী অধ্যাপক শিবপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।
বাঙালি ভূবিজ্ঞানী পদ্মভূষণ অধ্যাপক শিবপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।
মেঘালয় রাজ্যের নামকরণ
কলকাতার জিয়োগ্রাফিক্যাল সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা এবং ভারতীয় ভূগোলের জনক পদ্মভূষণ প্রাপক অধ্যাপক শিবপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ( জন্ম- ১৯০৩ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারি - মৃত্যু -১৯৮৯ সালের ২৭ শে ফেব্রুয়ারি) নদীয়ার শান্তিপুরে জন্মগ্রহণ করেন। শান্তিপুরেরই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিনি প্রথম শিক্ষাগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর স্নাতকোত্তরের জন্য বেনাসর হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯২৬ সালে ভূতত্ত্বে এম.এসসি. ডিগ্রি অর্জন করে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যান। প্যারিসের সোরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিখ্যাত ভূগোলবিদ ইমানুয়েল ডি. মর্তোনে এবং পল ভিদাল দে লা ব্লাচ এর অধীনে অসমের দুটি জেলা গারো, খাসি ও জয়ন্তিয়া পাহাড়ের উপত্যকার ভূবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করে প্যারিসের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৬ সালে ডি. লিট. ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি তার গবেষণাগ্রন্থ– লে প্লাটু দে মেঘালায়া ( "Le Plateau de Meghalaya") মেঘপুঞ্জের পাহাড়ি এলাকাটিকে নাম দিয়েছিলেন– "মেঘালয়"। মেঘালয়" শব্দের অর্থ হল "মেঘের আবাস" বা "মেঘের বাসস্থান"। এই নামটি হিমালয়ের নামকরণের অনুকরণে দেওয়া হয় যেখানে হিমালয় অর্থ "তুষারের আবাস"। এই নামটি পরবর্তীতে সরকারি স্বীকৃতি পায়, এবং ১৯৭০–৭২ সালের মধ্যে ভারত সরকার “মেঘালয়” নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। আসামের দুটি জেলা—খাসি-জয়ন্তীয়া পাহাড় এবং গারো পাহাড়—মিলিয়ে গঠিত হয় ভারতের নতুন রাজ্য মেঘালয়।
©®- তাপস কুমার পাল
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মনোরম মেঘালয়ের পাহাড়ি কোলে, শিলং থেকে প্রায় ৫০-৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এক বিস্ময়কর গ্রাম — কংথং (Kongthong)। এই ছোট্ট গ্রামটি পৃথিবীর মানচিত্রে এক অনন্য পরিচয়ে পরিচিত — সুরের গ্রাম বা "সিটি বাজানোর গ্রাম" ("Whistling Village") নামে।
যে গ্রামে নাম নয়, সুরেই পরিচয়
মেঘালয়ের কংথং (Kongthong) গ্রামে প্রতিটি বাসিন্দার পরিচয় নির্ধারিত হয় তাদের নিজস্ব সুর বা হুইসল দ্বারা। এখানে কারও নাম ধরে ডাকা হয় না — বরং তার জন্য নির্দিষ্ট একটি সুর বাজানো হয়। এই বিশেষ সুরটি তৈরি করেন শিশুর মা, ভালোবাসা ও মমতার মিশেলে। মায়ের সৃষ্টি করা সেই সুরকেই বলা হয় “Jingrwai Iawbei”, যার অর্থ “মায়ের তৈরি গান”।
কংথংবাসীদের জন্য এই “জিংরোয়াই ইয়াওবেই” শুধু নাম নয়, বরং এক জীবন্ত সুরেলা নামকরণ প্রথা — যা একদিকে মায়ের ভালোবাসার প্রতীক, অন্যদিকে সঙ্গীতের মাধ্যমে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করার এক অনন্য মাধ্যম। ঐতিহাসিকভাবে এই প্রথা শতাব্দী প্রাচীন এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের খাসি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই ঐতিহ্য সুরের মাধ্যমে উত্তরাধিকার হিসেবে বহমান। এছাড়া “জিংরোয়াই ইয়াওবেই” শুধু একটি ব্যক্তিগত পরিচয় নয়; এটি পরিবারের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের সুরেলা চিহ্ন। এই ঐতিহ্য গ্রামীণ সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক, ভালোবাসা এবং সামাজিক ঐক্যকে বহুগুণে জোরদার করে তোলে। শিশুর জন্মের পর মা নিজেই তার সন্তানের জন্য একটি বিশেষ সুর তৈরি করেন, যা সারাজীবন ধরে সেই সন্তানের পরিচয়ের প্রতীক হয়ে থাকে। গ্রামে কেউ যদি দূর থেকে কাউকে ডাকতে চান, তিনি শুধু সেই ব্যক্তির সুরটি বাজান — আর তাতেই জানা যায়, কাকে ডাকা হচ্ছে।
প্রথাগত সংস্কৃতির অনন্য ধারা
প্রায় ৭০০ জন বাসিন্দা-সম্পন্ন এই গ্রামটি মেঘালয়ের খাসি জনগোষ্ঠীর এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। এটি কেবল যোগাযোগের এক অভিনব পদ্ধতি নয়, বরং মানবসম্পর্কের সুরেলা ভাষা — যেখানে ভালোবাসা, আত্মপরিচয় ও সমাজবোধ একসাথে মিশে যায় সংগীতের ছন্দে।
বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি
এই অনন্য প্রথা ও সংস্কৃতির কারণে ইউনাইটেড নেশনস ওয়ার্ল্ড ট্যুরিজম অর্গানাইজেশন (UNWTO) কংথং গ্রামকে দিয়েছে “সেরা পর্যটন গ্রাম” (World’s Best Tourism Village)-এর স্বীকৃতি। এটি শুধু ভারতের নয়, সমগ্র বিশ্বের এক সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
সুরের মাধ্যমে সম্পর্কের দুনিয়া
কংথং গ্রাম যেন এক জীবন্ত সঙ্গীতময় সমাজ — যেখানে প্রত্যেক মানুষ একটি সুর, প্রত্যেক সম্পর্ক একটি রাগিনী, আর প্রতিটি আহ্বান এক মধুর সিটি। এমন এক গ্রাম, যেখানে মানুষকে নাম নয়, সুরে চিনে নেওয়া যায়। এই "মেঘালয় রাজ্যের" নামকরণ করেন এক বাঙালি ভূবিজ্ঞানী অধ্যাপক শিবপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।
বাঙালি ভূবিজ্ঞানী পদ্মভূষণ অধ্যাপক শিবপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।
মেঘালয় রাজ্যের নামকরণ
কলকাতার জিয়োগ্রাফিক্যাল সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা এবং ভারতীয় ভূগোলের জনক পদ্মভূষণ প্রাপক অধ্যাপক শিবপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ( জন্ম- ১৯০৩ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারি - মৃত্যু -১৯৮৯ সালের ২৭ শে ফেব্রুয়ারি) নদীয়ার শান্তিপুরে জন্মগ্রহণ করেন। শান্তিপুরেরই প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিনি প্রথম শিক্ষাগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর স্নাতকোত্তরের জন্য বেনাসর হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৯২৬ সালে ভূতত্ত্বে এম.এসসি. ডিগ্রি অর্জন করে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যান। প্যারিসের সোরবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিখ্যাত ভূগোলবিদ ইমানুয়েল ডি. মর্তোনে এবং পল ভিদাল দে লা ব্লাচ এর অধীনে অসমের দুটি জেলা গারো, খাসি ও জয়ন্তিয়া পাহাড়ের উপত্যকার ভূবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করে প্যারিসের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৬ সালে ডি. লিট. ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি তার গবেষণাগ্রন্থ– লে প্লাটু দে মেঘালায়া ( "Le Plateau de Meghalaya") মেঘপুঞ্জের পাহাড়ি এলাকাটিকে নাম দিয়েছিলেন– "মেঘালয়"। মেঘালয়" শব্দের অর্থ হল "মেঘের আবাস" বা "মেঘের বাসস্থান"। এই নামটি হিমালয়ের নামকরণের অনুকরণে দেওয়া হয় যেখানে হিমালয় অর্থ "তুষারের আবাস"। এই নামটি পরবর্তীতে সরকারি স্বীকৃতি পায়, এবং ১৯৭০–৭২ সালের মধ্যে ভারত সরকার “মেঘালয়” নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। আসামের দুটি জেলা—খাসি-জয়ন্তীয়া পাহাড় এবং গারো পাহাড়—মিলিয়ে গঠিত হয় ভারতের নতুন রাজ্য মেঘালয়।
Comments