হাতপাখা

হাতপাখার ইতিহাস
- তাপস কুমার পাল। 



হাতপাখার ইতিহাস প্রায় ৩০০০ বছরেরও পুরনো। মিশরীয় সভ্যতায় রাজা-ফারাওদের সিংহাসনের পাশে ময়ূরের পালক বা রেশম দিয়ে তৈরি বিশাল পাখা ব্যবহার করা হতো। এগুলি রাজকীয় মর্যাদা ও ক্ষমতার প্রতীক ছিল। শুধু শীতল হাওয়া নয়, হাতপাখা তখন রাজসভার অলংকারও হয়ে উঠেছিল।

গ্রিক ও রোমান সভ্যতাতেও হাতপাখার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানেও ধনী-সম্ভ্রান্তরা সূক্ষ্ম বস্ত্র ও পালক দিয়ে পাখা ব্যবহার করতেন। আর ভারতে হাতপাখার ইতিহাসও সমানভাবে প্রাচীন। প্রাকৃতিক উপকরণ—তালপাতা, শালপাতা, বাঁশ, খাগড়া, এমনকি কাপড় দিয়েও হাতপাখা তৈরি হতো। গ্রামীণ সমাজে গরমের দিনে হাতপাখা ছিল অপরিহার্য। মাটির ঘরে, উঠোনে, মাঠে কৃষিকাজের ফাঁকে কিংবা মন্দির-মসজিদে—সবখানেই হাতপাখার ব্যবহার দেখা যেত।


গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় হাতপাখা:

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিত
প্রাচীন গ্রিক সভ্যতায় হাতপাখা ছিল অভিজাত জীবনযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। খ্রিস্টপূর্ব ৫ম–৪র্থ শতাব্দীর গ্রিক ভাস্কর্য ও পাত্রচিত্রে (Attic vase paintings) দেখা যায়, রাজপরিবার বা উচ্চবিত্ত নারীদের পাশে দাসীরা পালক বা সূক্ষ্ম বস্ত্রের তৈরি পাখা দোলাচ্ছে। গবেষক জন বোর্ডম্যান (John Boardman) তাঁর Greek Art গ্রন্থে উল্লেখ করেন, এই পাখাগুলি শুধুমাত্র আরামদায়ক উপকরণ ছিল না, বরং সামাজিক স্তরবিভাজনের দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।

গ্রিক সাহিত্যেও হাতপাখার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। হেলেনিস্টিক যুগের কবিতা ও নাটকে রাজসভা ও অভিজাত গৃহস্থালির বর্ণনায় পাখা-ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। বিশেষ করে সৌন্দর্য ও প্রেমের দেবী অ্যাফ্রোদিতির (Aphrodite) চিত্রণে দাসীদের হাতে পালকের পাখা দেখা যায়, যা দেবীর ঐশ্বর্য ও কোমলতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।


রোমান সভ্যতায় হাতপাখা আরও সুসংগঠিত সামাজিক প্রতীকে পরিণত হয়। লাতিন ভাষায় একে বলা হতো flabellum। প্লিনি দ্য এল্ডার (Pliny the Elder) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Naturalis Historia-তে রোমান অভিজাতদের ভোজসভা ও জনসমাবেশে হাতপাখার ব্যবহার সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন। রোমান সেনেটর, প্যাট্রিশিয়ান শ্রেণি এবং উচ্চবিত্ত নারীরা সূক্ষ্ম রেশম, হাতির দাঁত, ধাতু বা ময়ূরের পালক দিয়ে তৈরি পাখা ব্যবহার করতেন।
 ©®তাপসকুমারপাল
রোমান মুরাল (Pompeii ও Herculaneum-এর দেয়ালচিত্র) এবং মোজাইক শিল্পে হাতপাখার চিত্র বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এসব চিত্রে দেখা যায়—দাসীরা অভিজাতদের পাশে দাঁড়িয়ে পাখা দোলাচ্ছে, যা রোমান দাসপ্রথা ও ক্ষমতার কাঠামোর একটি স্পষ্ট সাংস্কৃতিক দলিল। গবেষক মেরি বিয়ার্ড (Mary Beard) তাঁর SPQR: A History of Ancient Rome গ্রন্থে উল্লেখ করেন, হাতপাখা রোমান সমাজে “luxury, leisure and power”-এর প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

রোমান নারীদের ক্ষেত্রে হাতপাখা সৌন্দর্যচর্চার অংশ হয়ে ওঠে। ছোট আকারের অলংকৃত পাখা ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী হিসেবে জনপ্রিয় ছিল। ফলে গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় হাতপাখা কেবল দৈনন্দিন প্রয়োজন নয়, বরং শিল্প, সাহিত্য, ধর্মীয় প্রতীক এবং সামাজিক মর্যাদার এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক চিহ্নে পরিণত হয়।



বিদেশের লোকাচারে হাতপাখা

বিদেশের নানা লোকজ সংস্কৃতিতেও হাতপাখা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। চীনের লোকাচারে হাতপাখা ছিল শিক্ষিত সমাজ ও শিল্পীদের প্রতীক। কাগজ বা রেশমের পাখায় কবিতা, ক্যালিগ্রাফি ও প্রকৃতির দৃশ্য আঁকা হতো। চীনা লোকনাট্য ও নৃত্যে হাতপাখা আজও অপরিহার্য উপাদান।

জাপানের লোকসংস্কৃতিতে উচিওয়া ও সেন্সু নামক হাতপাখা উৎসব, নৃত্য ও নাটকে ব্যবহৃত হয়। লোকনৃত্যে হাতপাখার ভঙ্গিমা দিয়ে প্রকৃতি, আবেগ ও সামাজিক সম্পর্ক প্রকাশ করা হয়।


ইউরোপের লোকাচারে হাতপাখা বিশেষত স্পেন ও ইতালিতে জনপ্রিয় ছিল। স্পেনের ফ্ল্যামেঙ্কো নৃত্যে হাতপাখা আবেগ, লজ্জা, প্রেম ও প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইতালির গ্রামীণ উৎসব ও নাট্যপরিবেশনায় হাতপাখা সামাজিক আচরণ ও সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটায়।
 ©®তাপসকুমারপাল
আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে তালপাতা ও পশুপালকের লোম দিয়ে তৈরি পাখা লোকাচারের অংশ। উপজাতীয় নৃত্য, ধর্মীয় আচার ও প্রধানের সভায় হাতপাখা ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।




ভারতীয় উপমহাদেশে 
হাতপাখা ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যবহার


ধর্মীয় আচারে হাতপাখার বিশেষ ভূমিকা ছিল। মন্দিরে দেবদেবীর পূজায় হাতপাখা দোলানো হতো, যাতে দেবতার কাছে শীতল বাতাস পৌঁছায়। মসজিদেও গরমের দিনে নামাজের সময় হাতপাখা ব্যবহার করা হতো। বিয়ে, অন্নপ্রাশনসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে হাতপাখা শুধু ব্যবহারিক জিনিস নয়, বরং ঐতিহ্যের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজও অনেক অঞ্চলে বিয়েতে কনের সাজে রঙিন হাতপাখা ব্যবহার করা হয়।


বাংলার লোকাচারে হাতপাখা

বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে হাতপাখা শুধু গরম নিবারণের উপকরণ নয়, বরং দৈনন্দিন জীবন, আচার-অনুষ্ঠান ও লোকশিল্পের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। গ্রামীণ বাংলায় তালপাতা, শালপাতা ও বাঁশ দিয়ে তৈরি হাতপাখা ঘরে ঘরে ব্যবহৃত হতো। গ্রীষ্মকালে দুপুরের ভাতের পর উঠোনে বসে হাতপাখা দোলানো—এই দৃশ্য গ্রামবাংলার চিরচেনা ছবি।

লোকাচারে হাতপাখার প্রতীকী ব্যবহারও লক্ষণীয়। বিয়ের সময় কনের পাশে রঙিন হাতপাখা রাখা হতো, যা লজ্জা, শীতলতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। অনেক অঞ্চলে নববধূর সাজে হাতপাখা ছিল ঐতিহ্যগত অলংকার। শিশুর অন্নপ্রাশন বা নামকরণ অনুষ্ঠানে হাতপাখা দিয়ে শিশুকে বাতাস দেওয়া হতো—যা মঙ্গল ও সুরক্ষার প্রতীক।

বাংলার লোকধর্ম ও পূজার আচারেও হাতপাখার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। কীর্তন, ভজন বা পালাগানের আসরে শিল্পীরা দীর্ঘ সময় বসে গান গাওয়ার সময় হাতপাখা ব্যবহার করতেন। মন্দিরে দেবদেবীর সামনে হাতপাখা দোলানো হতো, যা ভক্তির সঙ্গে শীতলতার ভাব যুক্ত করত। লোকগানে ও প্রবাদে হাতপাখা প্রায়ই রূপক হিসেবে এসেছে—কখনো বিরহ, কখনো স্নিগ্ধতার প্রতীক রূপে।

 ©®তাপসকুমারপাল

বাংলার লোকশিল্পে হাতপাখা

বাংলায় হাতপাখা কেবল প্রাত্যহিক ব্যবহার নয়, লোকশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তালপাতার উপর রঙিন আঁকা—ফুল, পাখি, গাছ, কিংবা গ্রামীণ জীবনের দৃশ্য—লোকপাখাকে শিল্পময় রূপ দিত। এ ধরনের হাতপাখা এখনো হস্তশিল্প মেলায় পাওয়া যায়।

লোক গানে হাত পাখা

লোকগানে হাতপাখার উল্লেখও বিশেষভাবে পাওয়া যায়—“ওরে ও আমার মন ময়ূর হয়ে যাস না...” কিংবা “ওরে ওরে নতুন হাতপাখা...” জাতীয় গানে হাতপাখা এক রোমান্টিক ও আবেগঘন প্রতীক হয়ে ওঠে।


বাংলা হোক বা বিদেশ—লোকাচারে হাতপাখা কেবল ব্যবহারিক বস্তু নয়। এটি আবহাওয়া, সংস্কৃতি, শিল্প ও মানুষের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক চিরন্তন লোকজ প্রতীক।



আধুনিক যুগে হাতপাখা

আজ বিদ্যুতের পাখা ও এয়ারকন্ডিশনারের যুগে হাতপাখার ব্যবহার কমে এসেছে। তবু এটি ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে আছে। গ্রামীণ মেলায়, লোকসংগীতে, কিংবা ঘরের শোভা বৃদ্ধির উপকরণ হিসেবে হাতপাখা আজও সমান জনপ্রিয়।
©®তাপসকুমারপাল

Comments

Popular posts from this blog

একক বাদনের সুরে স্মরণে পণ্ডিত ভি. জি. যোগ

বৌদ্ধ মূর্তিতে কোঁকড়ানো চুলের রহস্য

টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার — কবিতা ও সঙ্গীত