শিল্পী অ্যালেক্সান্ড্রোস অফ অ্যান্টিওক ভাস্কর্যে সুর, নীরবতায় সংগীত

শিল্পী অ্যালেক্সান্ড্রোস অফ অ্যান্টিওক
ভাস্কর্যে সুর, নীরবতায় সংগীত
- তাপস কুমার পাল




শিল্পী অ্যালেক্সান্ড্রোস অফ অ্যান্টিওকের নাম কি আগে শুনেছেন? আমি হলফ করে বলতে পারি না আগে শোনেন নি। কিন্তু যদি বলি পৃথিবীর ১০ সেরার সেরা ভাস্কর্যের মধ্যে প্রথম ভাস্কর্যের সৃষ্টিতে তাঁর নামটি আসে, নিশ্চয়ই ভাবনাটা একটু উস্কে দিলাম আপনাকে তাই না, হ্যাঁ ঠিকই বলছি শিল্পী অ্যালেক্সান্ড্রোস অফ অ্যান্টিওক (Alexandros of Antioch) হলেন "ভেনাস ডে মিলো (Venus de Milo)" র সৃষ্টি কর্তা। ভাস্কর্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি বিশ্ব বন্দিত এবং শিল্প ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

প্রাচীন গ্রিসে "Musike" (মিউজিক) শব্দটি দিয়ে শুধু গান বোঝানো হতো না, এটি ছিল কবিতা, নাচ এবং সংগীতের এক সমন্বিত রূপ। তাই একজন শিল্পী যখন কোনো ভাস্কর্য তৈরি করতেন, তিনি প্রায়ই সেটিকে কোনো মহাকাব্য বা নির্দিষ্ট সুরের (Rhythm) প্রতিফলন হিসেবে দেখতেন। আর প্রাচীন গ্রিক–হেলেনিস্টিক শিল্পের ইতিহাসে যে ক’জন শিল্পীর নাম আজও আলোচনার কেন্দ্রে, তাঁদের মধ্যে অ্যালেক্সান্ড্রোস অফ অ্যান্টিওক (Alexandros of Antioch) একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। তাঁর শিল্পকর্ম শুধু নান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং গ্রিক শিল্পের এক সন্ধিক্ষণকে চিহ্নিত করার জন্যও স্মরণীয়।

©®তাপস কুমার পাল

অ্যালেক্সান্ড্রোস অফ অ্যান্টিওক (Alexandros of Antioch) ছিলেন খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের একজন হেলেনিস্টিক যুগের গ্রিক ভাস্কর। তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত “অফ অ্যান্টিওক” উপাধিটি ইঙ্গিত দেয় যে তিনি সম্ভবত অ্যান্টিওক নগরী বা তার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই সময়কাল ছিল গ্রিক শিল্পের একটি রূপান্তরকাল—যেখানে ক্লাসিক্যাল সংযমের সঙ্গে আবেগ, গতি ও নাটকীয়তা যুক্ত হতে শুরু করে।

অ্যালেক্সান্ড্রোস অফ অ্যান্টিওকের ব্যক্তিগত সঙ্গীতচর্চা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ঐতিহাসিক দলিল নেই—এটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা জরুরি। কোনো প্রাচীন লেখক বা শিলালিপিতে তাঁকে সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।
তবু সঙ্গীতের প্রভাব কোথায়?
হেলেনিস্টিক যুগে শিল্প ও সঙ্গীত ছিল একে অপরের পরিপূরক। সেই প্রেক্ষিতে বলা যায়—
ভাস্কর্যের ছন্দ, ভারসাম্য ও প্রবাহ সঙ্গীতের তাল ও লয়ের সঙ্গে তুলনীয়। গ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় (paideia) ভাস্কর, কবি ও সঙ্গীতজ্ঞদের মধ্যে আদর্শগত মিল ছিল। সৌন্দর্যের ধারণা (harmonia) সঙ্গীত ও ভাস্কর্য—উভয়ের মধ্যেই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ
অতএব, অ্যালেক্সান্ড্রোস সরাসরি সঙ্গীতচর্চা করতেন কি না জানা না গেলেও, সঙ্গীতবোধ তাঁর শিল্পচিন্তাকে প্রভাবিত করেছিল—এ কথা বলা অযৌক্তিক নয়।
শিল্প ও সঙ্গীত: হেলেনিস্টিক ঐক্যবোধ
গ্রিক দর্শনে শিল্প মানেই ছিল—
Rhythm (ছন্দ)
Balance (সাম্য)
Emotion (রস)
ভেনাস দে মিলোর মূর্তিতে যে নীরব সুরেলা আবহ পাওয়া যায়, তা যেন এক ধরনের দৃষ্টিগ্রাহ্য সংগীত—যেখানে পাথর নীরব, কিন্তু অনুভূতি সজীব।
©®তাপস কুমার পাল


এবার আসি অ্যালেক্সান্ড্রোস অফ অ্যান্টিওক (Alexandros of Antioch) এর অমর ভাস্কর্য ভেনাস ডে মিলো (Venus de Milo) —


ভেনাস ডে মিলো, যা মিলোর অ্যাফ্রোদিতি নামেও পরিচিত। এই মার্বেল ভাস্কর্যটি গ্রিক দেবী অ্যাফলডাইট (ভেনাস) কে প্রতিনিধিত্ব করে।

ভেনাস ডে মিলোটি ১৮২০ সালে গ্রিসের মিলোস দ্বীপে আবিষ্কৃত হয়। একজন স্থানীয় কৃষক ইয়োর্গোস কেন্ত্রোতাস (Yorgos Kentrotas)। কিছু ঐতিহাসিক নথিতে তাকে 'গিওর্গোস' (Giorgos) নামেও উল্লেখ করা হয়েছে। কেন্ত্রোতাস মূলত একজন জলপাই (Olive) চাষি ছিলেন। তিনি একটি খামার বাড়ির প্রাচীন দেওয়াল থেকে পাথর সরানোর সময় এটি খুঁজে পান, এবং
সেই সময় ফরাসি নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তা অলিভিয়ের ভুতিয়ের (Olivier Voutier) সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি বুঝতে পারেন এটি একটি অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। তাঁর উদ্যোগেই শেষ পর্যন্ত মূর্তিটি ফ্রান্সে নিয়ে যাওয়া হয়।


শিল্পী অ্যালেক্সান্ড্রোস অফ অ্যান্টিওক, খ্রিস্টপূর্ব ১৫০-১১০ অব্দের মধ্যে নির্মিত বলে মনে করা হয়। (মতান্তরে, প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১২০–১৩০ সালে নির্মিত।)
কেনেথ ক্লার্ক এটিকে "প্রাচীন গ্রিসের শেষ মহান কাজ" বলে বর্ণনা করেছেন, যাতে ক্লাসিকাল ও বারোক উভয় শৈলীর মিশ্রণ রয়েছে। এটি প্যারিয়ান মার্বেল দিয়ে নির্মিত, উচ্চতা ২ মিটারের বেশি। দেহের উপরের অংশ উলঙ্গ, নিচের অংশে পোশাক জড়ানো, ডান পায়ে ওজন দিয়ে দাঁড়ানো এবং মুখ বাঁয়ে ফেরানো। দুই হাত, বাঁ পা এবং কানের লতি অনুপস্থিত। এটি সম্ভবত প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী অ্যাফ্রোদিতিকে (রোমান ভেনাস) চিত্রিত করে।

©®তাপস কুমার পাল



আবিষ্কারের পর থেকে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রিক মূর্তি হয়ে ওঠে। হাতহীনতা নিয়ে বিতর্ক সত্ত্বেও এর সৌন্দর্য ও শিল্পমূল্য অপরিসীম। লুভরে এটি কেন্দ্রীয় আকর্ষণ। ১৮২১ সাল থেকে লুভরে প্রদর্শিত হচ্ছে এটি।

অ্যালেক্সান্ড্রোস অফ অ্যান্টিওক ছিলেন এমন এক শিল্পী, যাঁর কর্মে হেলেনিস্টিক যুগের সৌন্দর্যবোধ পূর্ণতা পেয়েছে। তাঁর ভাস্কর্যে আমরা শুধু পাথরের কারুকার্য দেখি না—দেখি এক সুরেলা মানবতাবোধ, যেখানে শিল্প ও সঙ্গীত আলাদা নয়, বরং একই নান্দনিক দর্শনের দুই রূপ। আজও ভেনাস দে মিলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
শিল্প যখন সত্যিকারের হয়, তখন তা নীরব থেকেও সংগীতের মতো কথা বলে।

©®তাপস কুমার পাল

টিপ্পনী
(১) হেলেনিস্টিক যুগ খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩ সালে আলেকজান্ডারের মৃত্যু দিয়ে শুরু হয় এবং সাধারণত খ্রিস্টপূর্ব ৩১ সালের অ্যাক্টিয়ামের যুদ্ধ বা খ্রিস্টপূর্ব ১৪৬ সালে রোমান বিজয়ের সাথে শেষ হয়। এটি হেলেনিক যুগের (খ্রিস্টপূর্ব ২০০০-৩৩৬) পরবর্তী পর্যায়, যেখানে গ্রিক নগররাষ্ট্রের পরিবর্তে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। মেসিডোনিয়ান রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ এবং তার পুত্র আলেকজান্ডারের বিজয় এর ভিত্তি স্থাপন করে।

(২) অ্যান্টিওক সেলুসিড রাজাদের প্রধান আস্তানা হয়ে ওঠে, যেখান থেকে তারা আনাতোলিয়া থেকে পারস্য পর্যন্ত অঞ্চল শাসন করতেন। সেলুকাস ও তার উত্তরসূরিরা এখান থেকে সাম্রাজ্যের পশ্চিমাংশ পরিচালনা করেন, যা হেলেনিস্টিক রাজতন্ত্রের প্রতীক ছিল। পরবর্তীতে রোমানরা এটিকে সিরিয়া প্রদেশের রাজধানী করে।

(৩) প্রাচীন গ্রিসে শিল্প ও সাহিত্যকে আলাদা করে দেখা হতো না। অনেক বড় ভাস্করই শব্দ বা সুরের কারিগর ছিলেন। নিচে অ্যালেক্সান্ড্রোস অফ অ্যান্টিওকের মতো আরও কয়েকজন বহুমুখী প্রতিভার উদাহরণ দেওয়া হলো:
​১. দাইদালুস (Daedalus) – কিংবদন্তি শিল্পী
​গ্রিক পুরাণে দাইদালুসকে প্রথম মহান ভাস্কর এবং স্থপতি ধরা হয়। তবে তাঁর পরিচয় শুধুমাত্র পাথরে সীমাবদ্ধ ছিল না।তিনিই প্রথম ভাস্কর যিনি মূর্তির চোখ খোলা এবং হাত-পা শরীর থেকে আলাদা করে দেখানোর কৌশল শুরু করেন (যাতে মূর্তিটি জীবন্ত মনে হয়)।

তিনি প্রাচীন নাচের মঞ্চ তৈরি করেছিলেন এবং অনেক লোককথায় তাঁকে সুর ও ছন্দের একজন উদ্ভাবক হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

​২. ফিদিয়াস (Phidias) – পারথেননের স্রষ্টা
​যাঁকে সর্বকালের সেরা গ্রিক ভাস্কর বলা হয় (যিনি অলিম্পিয়ার জিউসের মূর্তি তৈরি করেছিলেন)। তাঁর মূর্তিতে 'স্বর্ণালী অনুপাত' বা Golden Ratio ব্যবহার করতেন যা গণিত এবং শিল্পের এক অপূর্ব মিশ্রণ। যদিও তিনি মূলত ভাস্কর ছিলেন, তবে তৎকালীন সময়ের দার্শনিক এবং কবিদের সাথে তাঁর গভীর যোগাযোগ ছিল এবং তাঁর কাজে মহাকাব্যের (যেমন ইলিয়াড) দৃশ্যপট অত্যন্ত কাব্যিক ঢঙে ফুটে উঠত।



©®তাপস কুমার পাল 

Comments

Popular posts from this blog

একক বাদনের সুরে স্মরণে পণ্ডিত ভি. জি. যোগ

বৌদ্ধ মূর্তিতে কোঁকড়ানো চুলের রহস্য

টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার — কবিতা ও সঙ্গীত