ভারতীয় উচ্চাঙ্গসংগীতের সুরের মালা জপের মালার থেকেও ভীষণ কার্যকরী
ভারতীয় উচ্চাঙ্গসংগীতের সুরের মালা জপের মালার থেকেও ভীষণ কার্যকরী
- তাপস কুমার পাল
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে যুগ যুগ ধরে শুধু শ্রোতার আনন্দবর্ধক নয়, মনোবিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক সাধনার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে গৃহীত হয়েছে। রাগরাগিণীর মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্বরায়ন বা ক্রমানুসারে সুর বিন্যাস মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে একাগ্রতা, শান্তি ও অন্তর্মুখিতার দিকে টানে—এ কারণেই কেউ কেউ সুরের মালা জপের মালা অপেক্ষা “আরও কার্যকরী” বলে গণ্য করেন।
জপের মালা ও সুরের মালার মূল পার্থক্য হল:-
জপের মালা ধর্মীয় মন্ত্র সংখ্যাগণন ও মনোনিবেশের সরঞ্জাম হিসেবে কাজ করে, যেখানে প্রতিটি দানি প্রতিটি মন্ত্র জপের সঙ্গে বাঁধা থাকে।
আর উচ্চাঙ্গ সংগীতের সুর (রাগ) প্রতিটি স্বর, বাদী–সম্বাদী সম্পর্ক ও লয় দিয়ে মনের তরঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাই কিছু চিন্তা‑প্রবাহে একে সুরের মালা জপও বলে অভিহিত করা হয়—যা জপের মালার চেয়ে তাত্ত্বিকভাবে “আরও ভীষণ কার্যকরী” হিসেবে বর্ণিত হয়। কারণ আপনার হৃদয় ভালো থাকলেই তবেই জপ-তপ। এই বিষয় একটা প্রবাদ প্রণিধান যোগ্য, " জপ তপ যাই করো মরতে জানলে হয়"। সত্যিই তো সারাজীবন জপতপ ঠাকুরের নাম করে গেলেন অথচ আপনি মনের সুইচ অফ অন করতে পারছেন না। কারণ আপনি জপ করতে করতে মন অন্যদিকে বিচরণ করতে পারে এবং সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু সঙ্গীত শিখলে আপনার মন কিন্তু একটি সুন্দর আধ্যাত্মিক ও ভাবগাম্ভীর্যময় মেজাজ তৈরি হয়। তাছাড়া আপনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কোমায় চলে গেলে আপনাকে ঔষধের পাশাপাশি মিউজিক থেরাপির সাহায্যে কিন্তু অনেক তাড়াতাড়ি সুস্থ্য করা সম্ভব। এই বিষয়ে কিছু আলোকপাত করা যাক।
©®তাপস কুমার পাল
সত্যি কি হৃদয় কে ভালো রাখার জন্য ভারতীয় উচ্চাঙ্গসংগীতের রাগরাগিণীর প্রয়োজন আছে?
বিষয়টি একটু অন্য ভাবে দেখা যাক। আমরা জানি, বিভিন্ন বয়সে স্বাভাবিক বিশ্রামকালীন হার্ট রেট (bpm) পরিবর্তিত হয়, কারণ শরীরের মেটাবলিজম এবং হার্টের কার্যকারিতা বয়সের সাথে পরিবর্তন ঘটে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণত ৬০-১০০ bpm স্বাভাবিক, যদিও অ্যাথলিটদের কম হতে পারে। নিম্নে বয়সভিত্তিক স্বাভাবিক "হার্ট রেট" / বা পালস রেট এর তালিকা দেওয়া হলো :-
বয়স গ্রুপ > স্বাভাবিক হার্ট রেট (bpm)
• নবজাতক (০-৪ সপ্তাহ) > ১০০-২০৫
• শিশু (১ মাস-১ বছর) > ১০০-১৮০
• বালক (১-৩ বছর) > ৯৮-১৪০
• প্রি-স্কুল (৩-৫ বছর) > ৮০-১২০
• স্কুল বয়সী (৬-১২ বছর) > ৭৫-১১৮
• কিশোর (১৩-১৮ বছর) > ৬০-১০০
• প্রাপ্তবয়স্ক (১৮+ বছর) > ৬০-১০০
• বয়স্ক (৬০+ বছর) > ৬০-১০০ (সাধারণত ৭০-৮৫)
সাধারণত পুরুষদের গড় ৭০-৭২ bpm, আর মহিলাদের ৭৮-৮২ bpm থাকে। আর মানুষের পালস রেট বা হৃদস্পন্দনের হার স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেলে তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় টাকাইকার্ডিয়া (Tachycardia) বলা হয়। সাধারণত একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বিশ্রামের সময় স্বাভাবিক পালস রেট মিনিটে ৬০ থেকে ১০০ বার থাকে। এটি ১০০-এর উপরে চলে গেলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব দেখা দিতে পারে।
©®তাপস কুমার পাল
আপনার পালস রেট বেড়ে গেলে যা যা হতে পারে:
✅১. তাৎক্ষণিক লক্ষণসমূহ:-
হৃৎপিণ্ড যখন খুব দ্রুত পাম্প করে, তখন এটি প্রতিটি স্পন্দনের মাঝে পুরোপুরি রক্ত দিয়ে পূর্ণ হওয়ার সময় পায় না। ফলে শরীরে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ ব্যাহত হয়, যার কারণে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়:
🟣 বুক ধড়ফড় করা (Palpitations): মনে হয় বুক কাঁপছে বা হৃদস্পন্দন খুব জোরে অনুভূত হচ্ছে।
🟣শ্বাসকষ্ট: শরীরে অক্সিজেনের অভাব মেটাতে ফুসফুস দ্রুত কাজ করার চেষ্টা করে, ফলে দম আটকে আসার মতো অনুভূত হয়।
🟣মাথা ঘোরা বা হালকা অনুভব করা: মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত না পৌঁছালে মাথা ঘুরতে পারে।
🟣 বুকে ব্যথা বা চাপ: হৃদপিণ্ডের পেশিতে অতিরিক্ত চাপের কারণে বুকে অস্বস্তি হতে পারে।
🟣 ক্লান্তি ও দুর্বলতা: শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
🟣অজ্ঞান হয়ে যাওয়া (Fainting): রক্তচাপ হঠাৎ কমে গেলে মানুষ জ্ঞান হারাতে পারে।
✅২. দীর্ঘমেয়াদী বা জটিল সমস্যা
যদি পালস রেট দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকে এবং চিকিৎসা করা না হয়, তবে কিছু গুরুতর সমস্যা হতে পারে:
🟣হার্ট ফেইলিওর: হৃদপিণ্ডের পেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে এবং রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে।
🟣স্ট্রোক: হৃৎপিণ্ডে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সেই জমাট বাঁধা রক্ত মস্তিষ্কে পৌঁছে স্ট্রোক ঘটাতে পারে।
🟣হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট: এটি বিরল হলেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যেখানে হৃৎপিণ্ড হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
©®তাপস কুমার পাল
কেন এমন হয়?
সব সময় পালস রেট বাড়া ভয়ের কারণ নয়। শারীরিক পরিশ্রম, ব্যায়াম, অতিরিক্ত উত্তেজনা, ভয় বা দুশ্চিন্তার সময় পালস রেট বাড়া স্বাভাবিক।
বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রক্রিয়াসঙ্গীত শ্রবণে অডিটরি কর্টেক্স থেকে সিঙ্গাল হাইপোথ্যালামাস এবং ভাগাস নার্ভে যায়, যা ভ্যাগাল টোন বাড়ায়। এতে RR ইন্টারভাল বৃদ্ধি পায় এবং হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি (HRV) উন্নত হয়, যা হার্টের স্থিতিশীলতার সূচক। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০-৩০ মিনিট রাগ টোড়ি তোড়ি বা ভৈরবী শোনায় হার্ট রেট ৮৪ bpm থেকে ৭৬ bpm-এ নামে।
মিউজিক থেরাপিতে হার্টের সমস্যা যেমন উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট রেটের অস্থিরতা বা স্ট্রেস-সম্পর্কিত সমস্যায় ভারতীয় ক্লাসিক্যাল রাগগুলি কার্যকরী। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট রাগ হার্ট রেট কমায়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং শরীরের প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেমকে সক্রিয় করে।
📌সকাল -৬ টা থেকে বেলা ৯ টা পর্যন্ত শুনতে পারেন - রাগ আহির ভৈরবী/আহির ভৈরব: রক্তচাপ (সিস্টোলিক, ডায়াস্টোলিক) উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে, হাইপারটেনশনে সেরা। কারণ এই রাগের প্রকৃতি: শান্ত, ভক্তিপূর্ণ, ধ্যানমগ্ন এবং আধ্যাত্মিক চিন্তার প্রতিচ্ছবি।
📌সকাল -৬ টা থেকে বেলা -৯ টা পর্যন্ত। রাগ ভৈরবী: উচ্চ রক্তচাপ, উদ্বেগ এবং হার্ট-সম্পর্কিত স্ট্রেস কমায়। কোমল ঋ, জ্ঞ, দ, ণ ব্যবহারের মাধ্যমে একটি সুন্দর আধ্যাত্মিক ও ভাবগাম্ভীর্যময় মেজাজ তৈরি হয়। অর্থাৎ এই রাগের প্রকৃতি, করুণ ও ভক্তিপূর্ণ । তবে এই রাগ সব সময় শোনা যায়।
📌সকাল ৯টা-১২টার মধ্যে শুনতে পারেন রাগ টোড়ি বা তোড়ি। যা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে ভীষণ কার্যকরী, হার্ট রেট এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের হার নিয়ন্ত্রণ করে। এই রাগের প্রকৃতি, কোমল স্বরের আধিক্যের কারণে এটি অত্যন্ত করুণ, গম্ভীর, বিষাদ ও গভীরতা–সমৃদ্ধ প্রকৃতি।
📌 সকাল ৯টা-১২টার মধ্যে শুনতে পারেন রাগ গুর্জরী (বা গুজরি টোড়ি) হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং গভীর ভাবগম্ভীর রাগ। এটি সাধারণত করুণ ও শান্ত রসের উদ্রেক করে।
📌সন্ধ্যা ৬ টা থেকে রাত ৯ টা র মধ্যে রাগ ইমন শুনতে পারে। রাগ ইমন - হার্ট চক্র (অনাহত চক্র) সক্রিয় করে মানসিক শান্তি দেয়, হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এই ইমন রাগের মেজাজ সাধারণত ভক্তিপূর্ণ, শান্ত ও গম্ভীর হয়ে থাকে। প্রার্থনাসঙ্গীত বা ভজন গাওয়ার ক্ষেত্রে এই রাগের বহুল ব্যবহার দেখা যায়।
📌রাত১২ টা থেকে ৩ টে র মধ্যে শুনতে পারেন রাগ মালকৌশ/ মালকোষ বা দরবারি কানাড়া। নিম্ন রক্তচাপের ক্ষেত্রে সাহায্য করে এবং হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি বাড়ায়। এই রাগের প্রকৃতি বা মেজাজ গম্ভীর, শান্ত রস ও ভক্তিপূর্ণ
📌রাত ৯ টা থেকে ১২ টা র সময় রাগ হংসধ্বনি শুনতে পারেন। এই রাগ হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি উন্নত করে স্ট্রেস কমায়। এই রাগের প্রকৃতি বা মেজাজ গম্ভীর, শান্ত ।
ব্যবহারের পরামর্শ দৈনিক ২০-৪৫ মিনিট শোনা যায়, সকাল বা সন্ধ্যায় ইন্সট্রুমেন্টাল এ আলাপ অংশ।
রাগ শোনায় হার্ট রেট কমে যায় কারণ এটি স্নায়ুতন্ত্রের প্যারাসিম্প্যাথেটিক অংশকে সক্রিয় করে, যা "রেস্ট অ্যান্ড ডাইজেস্ট" মোড চালু করে। ধীরগতির স্বর এবং নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি (৬০-৮০ Hz) অ্যামিগডালাকে শান্ত করে কর্টিসল কমায়, ফলে সাইম্প্যাথেটিক সিস্টেমের ওভারঅ্যাকটিভিটি থেমে হার্টের বিট রেট স্বাভাবিক হয়।
পরিশেষে এটা বলা যায় ভারতীয় উচ্চাঙ্গসংগীতের সুরের মালা জপের মালা থেকেও আপনার জীবনে ভীষণ কার্যকরী। তাই এর চর্চায় আপনাকে অনেক কিছু থেকে বাঁচাবে।।
তথ্যসূত্র
(1) THE MIRACLE OF MUSIC THERAPY - Rajendar Menen
(2) A New Horizon of Music Therapy
- Basumitra Majumder
(3) MUSIC THERAPY WITH INDIAN MUSIC (ESSENTIALS & SOURCES) : Volume 1 & 2 - Ruma Chakravarty.
(4) 100 Sessions of Indian Music Therapy With Seniors - Aradhana Deogharia.
ইত্যাদি।
©®তাপস কুমার পাল।।
- তাপস কুমার পাল
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে যুগ যুগ ধরে শুধু শ্রোতার আনন্দবর্ধক নয়, মনোবিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিক সাধনার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে গৃহীত হয়েছে। রাগরাগিণীর মাধ্যমে নির্দিষ্ট স্বরায়ন বা ক্রমানুসারে সুর বিন্যাস মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে একাগ্রতা, শান্তি ও অন্তর্মুখিতার দিকে টানে—এ কারণেই কেউ কেউ সুরের মালা জপের মালা অপেক্ষা “আরও কার্যকরী” বলে গণ্য করেন।
জপের মালা ও সুরের মালার মূল পার্থক্য হল:-
জপের মালা ধর্মীয় মন্ত্র সংখ্যাগণন ও মনোনিবেশের সরঞ্জাম হিসেবে কাজ করে, যেখানে প্রতিটি দানি প্রতিটি মন্ত্র জপের সঙ্গে বাঁধা থাকে।
আর উচ্চাঙ্গ সংগীতের সুর (রাগ) প্রতিটি স্বর, বাদী–সম্বাদী সম্পর্ক ও লয় দিয়ে মনের তরঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাই কিছু চিন্তা‑প্রবাহে একে সুরের মালা জপও বলে অভিহিত করা হয়—যা জপের মালার চেয়ে তাত্ত্বিকভাবে “আরও ভীষণ কার্যকরী” হিসেবে বর্ণিত হয়। কারণ আপনার হৃদয় ভালো থাকলেই তবেই জপ-তপ। এই বিষয় একটা প্রবাদ প্রণিধান যোগ্য, " জপ তপ যাই করো মরতে জানলে হয়"। সত্যিই তো সারাজীবন জপতপ ঠাকুরের নাম করে গেলেন অথচ আপনি মনের সুইচ অফ অন করতে পারছেন না। কারণ আপনি জপ করতে করতে মন অন্যদিকে বিচরণ করতে পারে এবং সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু সঙ্গীত শিখলে আপনার মন কিন্তু একটি সুন্দর আধ্যাত্মিক ও ভাবগাম্ভীর্যময় মেজাজ তৈরি হয়। তাছাড়া আপনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কোমায় চলে গেলে আপনাকে ঔষধের পাশাপাশি মিউজিক থেরাপির সাহায্যে কিন্তু অনেক তাড়াতাড়ি সুস্থ্য করা সম্ভব। এই বিষয়ে কিছু আলোকপাত করা যাক।
©®তাপস কুমার পাল
সত্যি কি হৃদয় কে ভালো রাখার জন্য ভারতীয় উচ্চাঙ্গসংগীতের রাগরাগিণীর প্রয়োজন আছে?
বিষয়টি একটু অন্য ভাবে দেখা যাক। আমরা জানি, বিভিন্ন বয়সে স্বাভাবিক বিশ্রামকালীন হার্ট রেট (bpm) পরিবর্তিত হয়, কারণ শরীরের মেটাবলিজম এবং হার্টের কার্যকারিতা বয়সের সাথে পরিবর্তন ঘটে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণত ৬০-১০০ bpm স্বাভাবিক, যদিও অ্যাথলিটদের কম হতে পারে। নিম্নে বয়সভিত্তিক স্বাভাবিক "হার্ট রেট" / বা পালস রেট এর তালিকা দেওয়া হলো :-
বয়স গ্রুপ > স্বাভাবিক হার্ট রেট (bpm)
• নবজাতক (০-৪ সপ্তাহ) > ১০০-২০৫
• শিশু (১ মাস-১ বছর) > ১০০-১৮০
• বালক (১-৩ বছর) > ৯৮-১৪০
• প্রি-স্কুল (৩-৫ বছর) > ৮০-১২০
• স্কুল বয়সী (৬-১২ বছর) > ৭৫-১১৮
• কিশোর (১৩-১৮ বছর) > ৬০-১০০
• প্রাপ্তবয়স্ক (১৮+ বছর) > ৬০-১০০
• বয়স্ক (৬০+ বছর) > ৬০-১০০ (সাধারণত ৭০-৮৫)
সাধারণত পুরুষদের গড় ৭০-৭২ bpm, আর মহিলাদের ৭৮-৮২ bpm থাকে। আর মানুষের পালস রেট বা হৃদস্পন্দনের হার স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেলে তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় টাকাইকার্ডিয়া (Tachycardia) বলা হয়। সাধারণত একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বিশ্রামের সময় স্বাভাবিক পালস রেট মিনিটে ৬০ থেকে ১০০ বার থাকে। এটি ১০০-এর উপরে চলে গেলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব দেখা দিতে পারে।
©®তাপস কুমার পাল
আপনার পালস রেট বেড়ে গেলে যা যা হতে পারে:
✅১. তাৎক্ষণিক লক্ষণসমূহ:-
হৃৎপিণ্ড যখন খুব দ্রুত পাম্প করে, তখন এটি প্রতিটি স্পন্দনের মাঝে পুরোপুরি রক্ত দিয়ে পূর্ণ হওয়ার সময় পায় না। ফলে শরীরে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ ব্যাহত হয়, যার কারণে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়:
🟣 বুক ধড়ফড় করা (Palpitations): মনে হয় বুক কাঁপছে বা হৃদস্পন্দন খুব জোরে অনুভূত হচ্ছে।
🟣শ্বাসকষ্ট: শরীরে অক্সিজেনের অভাব মেটাতে ফুসফুস দ্রুত কাজ করার চেষ্টা করে, ফলে দম আটকে আসার মতো অনুভূত হয়।
🟣মাথা ঘোরা বা হালকা অনুভব করা: মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত রক্ত না পৌঁছালে মাথা ঘুরতে পারে।
🟣 বুকে ব্যথা বা চাপ: হৃদপিণ্ডের পেশিতে অতিরিক্ত চাপের কারণে বুকে অস্বস্তি হতে পারে।
🟣 ক্লান্তি ও দুর্বলতা: শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
🟣অজ্ঞান হয়ে যাওয়া (Fainting): রক্তচাপ হঠাৎ কমে গেলে মানুষ জ্ঞান হারাতে পারে।
✅২. দীর্ঘমেয়াদী বা জটিল সমস্যা
যদি পালস রেট দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকে এবং চিকিৎসা করা না হয়, তবে কিছু গুরুতর সমস্যা হতে পারে:
🟣হার্ট ফেইলিওর: হৃদপিণ্ডের পেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে এবং রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে।
🟣স্ট্রোক: হৃৎপিণ্ডে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বেড়ে যায়। সেই জমাট বাঁধা রক্ত মস্তিষ্কে পৌঁছে স্ট্রোক ঘটাতে পারে।
🟣হঠাৎ কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট: এটি বিরল হলেও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যেখানে হৃৎপিণ্ড হঠাৎ কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
©®তাপস কুমার পাল
কেন এমন হয়?
সব সময় পালস রেট বাড়া ভয়ের কারণ নয়। শারীরিক পরিশ্রম, ব্যায়াম, অতিরিক্ত উত্তেজনা, ভয় বা দুশ্চিন্তার সময় পালস রেট বাড়া স্বাভাবিক।
বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রক্রিয়াসঙ্গীত শ্রবণে অডিটরি কর্টেক্স থেকে সিঙ্গাল হাইপোথ্যালামাস এবং ভাগাস নার্ভে যায়, যা ভ্যাগাল টোন বাড়ায়। এতে RR ইন্টারভাল বৃদ্ধি পায় এবং হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি (HRV) উন্নত হয়, যা হার্টের স্থিতিশীলতার সূচক। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০-৩০ মিনিট রাগ টোড়ি তোড়ি বা ভৈরবী শোনায় হার্ট রেট ৮৪ bpm থেকে ৭৬ bpm-এ নামে।
মিউজিক থেরাপিতে হার্টের সমস্যা যেমন উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট রেটের অস্থিরতা বা স্ট্রেস-সম্পর্কিত সমস্যায় ভারতীয় ক্লাসিক্যাল রাগগুলি কার্যকরী। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট রাগ হার্ট রেট কমায়, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং শরীরের প্যারাসিম্প্যাথেটিক সিস্টেমকে সক্রিয় করে।
📌সকাল -৬ টা থেকে বেলা ৯ টা পর্যন্ত শুনতে পারেন - রাগ আহির ভৈরবী/আহির ভৈরব: রক্তচাপ (সিস্টোলিক, ডায়াস্টোলিক) উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে, হাইপারটেনশনে সেরা। কারণ এই রাগের প্রকৃতি: শান্ত, ভক্তিপূর্ণ, ধ্যানমগ্ন এবং আধ্যাত্মিক চিন্তার প্রতিচ্ছবি।
📌সকাল -৬ টা থেকে বেলা -৯ টা পর্যন্ত। রাগ ভৈরবী: উচ্চ রক্তচাপ, উদ্বেগ এবং হার্ট-সম্পর্কিত স্ট্রেস কমায়। কোমল ঋ, জ্ঞ, দ, ণ ব্যবহারের মাধ্যমে একটি সুন্দর আধ্যাত্মিক ও ভাবগাম্ভীর্যময় মেজাজ তৈরি হয়। অর্থাৎ এই রাগের প্রকৃতি, করুণ ও ভক্তিপূর্ণ । তবে এই রাগ সব সময় শোনা যায়।
📌সকাল ৯টা-১২টার মধ্যে শুনতে পারেন রাগ টোড়ি বা তোড়ি। যা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে ভীষণ কার্যকরী, হার্ট রেট এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের হার নিয়ন্ত্রণ করে। এই রাগের প্রকৃতি, কোমল স্বরের আধিক্যের কারণে এটি অত্যন্ত করুণ, গম্ভীর, বিষাদ ও গভীরতা–সমৃদ্ধ প্রকৃতি।
📌 সকাল ৯টা-১২টার মধ্যে শুনতে পারেন রাগ গুর্জরী (বা গুজরি টোড়ি) হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং গভীর ভাবগম্ভীর রাগ। এটি সাধারণত করুণ ও শান্ত রসের উদ্রেক করে।
📌সন্ধ্যা ৬ টা থেকে রাত ৯ টা র মধ্যে রাগ ইমন শুনতে পারে। রাগ ইমন - হার্ট চক্র (অনাহত চক্র) সক্রিয় করে মানসিক শান্তি দেয়, হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এই ইমন রাগের মেজাজ সাধারণত ভক্তিপূর্ণ, শান্ত ও গম্ভীর হয়ে থাকে। প্রার্থনাসঙ্গীত বা ভজন গাওয়ার ক্ষেত্রে এই রাগের বহুল ব্যবহার দেখা যায়।
📌রাত১২ টা থেকে ৩ টে র মধ্যে শুনতে পারেন রাগ মালকৌশ/ মালকোষ বা দরবারি কানাড়া। নিম্ন রক্তচাপের ক্ষেত্রে সাহায্য করে এবং হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি বাড়ায়। এই রাগের প্রকৃতি বা মেজাজ গম্ভীর, শান্ত রস ও ভক্তিপূর্ণ
📌রাত ৯ টা থেকে ১২ টা র সময় রাগ হংসধ্বনি শুনতে পারেন। এই রাগ হার্ট রেট ভ্যারিয়েবিলিটি উন্নত করে স্ট্রেস কমায়। এই রাগের প্রকৃতি বা মেজাজ গম্ভীর, শান্ত ।
ব্যবহারের পরামর্শ দৈনিক ২০-৪৫ মিনিট শোনা যায়, সকাল বা সন্ধ্যায় ইন্সট্রুমেন্টাল এ আলাপ অংশ।
রাগ শোনায় হার্ট রেট কমে যায় কারণ এটি স্নায়ুতন্ত্রের প্যারাসিম্প্যাথেটিক অংশকে সক্রিয় করে, যা "রেস্ট অ্যান্ড ডাইজেস্ট" মোড চালু করে। ধীরগতির স্বর এবং নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সি (৬০-৮০ Hz) অ্যামিগডালাকে শান্ত করে কর্টিসল কমায়, ফলে সাইম্প্যাথেটিক সিস্টেমের ওভারঅ্যাকটিভিটি থেমে হার্টের বিট রেট স্বাভাবিক হয়।
পরিশেষে এটা বলা যায় ভারতীয় উচ্চাঙ্গসংগীতের সুরের মালা জপের মালা থেকেও আপনার জীবনে ভীষণ কার্যকরী। তাই এর চর্চায় আপনাকে অনেক কিছু থেকে বাঁচাবে।।
তথ্যসূত্র
(1) THE MIRACLE OF MUSIC THERAPY - Rajendar Menen
(2) A New Horizon of Music Therapy
- Basumitra Majumder
(3) MUSIC THERAPY WITH INDIAN MUSIC (ESSENTIALS & SOURCES) : Volume 1 & 2 - Ruma Chakravarty.
(4) 100 Sessions of Indian Music Therapy With Seniors - Aradhana Deogharia.
ইত্যাদি।
©®তাপস কুমার পাল।।
Comments