শিল্পের জন্য শিল্পী : আত্মহত্যা করতে পারেননি বিথোভেন

শিল্পের জন্য শিল্পী : আত্মহত্যা করতে পারেননি বিথোভেন

©®

পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের ইতিহাসে লুডভিগ ভ্যান বিথোভেন এক অমর নাম। তাঁর সৃষ্টির ভেতরে যেমন শক্তি, সংগ্রাম ও মানবিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, তেমনি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল গভীর যন্ত্রণা, নিঃসঙ্গতা এবং মানসিক দ্বন্দ্বে ভরা। বিশেষত তাঁর ক্রমবর্ধমান বধিরতা তাঁকে এক সময় আত্মহত্যার চিন্তার দোরগোড়ায় নিয়ে যায়—কিন্তু সেই অন্ধকার থেকেই জন্ম নেয় এক নতুন সঙ্গীতধারা। বিথোভেন এক সময় আত্মহত্যার চিন্তা করতেন প্রধানত তাঁর ক্রমবর্ধমান বধিরতা এবং এর ফলে সৃজনশীল ও সামাজিক জীবনের ধ্বংসের ভয়ে।

১৭৯৮ সাল থেকে শুরু হওয়া কানের সমস্যা ১৮০২ সাল নাগাদ চরমে পৌঁছে, যখন তিনি হাইলিগেনস্ট্যাড্টে ছিলেন হেইলিজেনস্ট্যাড 
(Heiligenstadt) হলো অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার ১৯তম জেলা ডবলিং-এর (Döbling) একটি এলাকা, যা ১৮৯২ সাল পর্যন্ত একটি স্বাধীন পৌরসভা ছিল। আর ডবলিং জেলার একটি মনোরম আবাসিক এলাকা, যেখানে আঙুর ক্ষেত এবং হাইক করার পথ রয়েছে।
©®
বিথোভেনকে চিকিৎসকরা অকার্যকর ভুল চিকিৎসা দিয়ে, এবং মিথ্যা আশা দিয়েছিল ছয় বছর ধরে, কিন্তু কানের কোনো উন্নতি হয়নি। এতে তিনি লিখেছেন, "আমি একটি অসাধ্য রোগে ভুগছি।" আর বধিরতার কারণে তিনি লোকজন এড়িয়ে চলতেন, যাতে রোগ লুকানো যায়, ফলে একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতা বাড়ে। সমাজে তাঁকে "মিস্যানথ্রপিক" ( Misanthropic/মানুষবিদ্বেষী) মনে করা হতো, যা তাঁকে আরও কষ্ট দিয়েছিল।


জার্মানির থুরিনগিয়া (Thuringia) অঙ্গরাজ্যের আইখসফেল্ড (Eichsfeld) জেলার একটি ঐতিহাসিক স্থান হেইলিজেনস্ট্যাড 
(Heiligenstadt)  ছয় মাস কাটিয়ে শুনতে না পাওয়ার সত্য উপলব্ধি করেন। এখানে থাকা কালিন একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে, এই সময় হতাশায় ভরা একটি চিঠি লেখেন, যা "হাইলিগেনস্ট্যাড্ট টেস্টামেন্ট" নামে পরিচিত। এতে তিনি লিখেছেন যে তিনি আত্মহত্যা ভেবেছিলেন কিন্তু সঙ্গীতের প্রতি দায়িত্ববোধ তাঁকে বাঁচিয়েছে: "আমি আত্মহত্যা করতে পারিনি কারণ আমার শিল্প আমাকে ছেড়ে যেতে দেয়নি।" এই হাইলিগেনস্ট্যাড্ট টেস্টামেন্টটি বিথোভেনের মৃত্যুর পর আবিষ্কৃত হয়েছে এবং এর ইতিহাস তাঁর ব্যক্তিগত সংকটের রহস্য উন্মোচন করে। এটি তাঁর সঙ্গীতের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে। (১৮০২ সালের অক্টোবরে) বিথোভেন এই চিঠিখানি ভাইদের নামে লেখেন কিন্তু কখনো পাঠাননি। এটি তাঁর টেবিলের ড্রয়ারে লুকানো থাকে এবং জীবদ্দশায় কেউ জানত না। এটি একটি আত্মজীবনীমূলক স্বস্বীকার পত্র। যা তাঁর বধিরতা ও মানসিক যন্ত্রণার বিবরণ দেয়।  ১৮২৭ সালে বিথোভেনের মৃত্যুর পর তাঁর ভাইয়ের ছেলে কর্ল ভন ভিথোভেন এবং সহকারী আন্তোন শিন্ডলার এটি খুঁজে পান। ১৮২৭ সালেরই নভেম্বরে প্রথম প্রকাশিত হয়, যখন শিন্ডলার এটি সঙ্গীতজগতের লোকদের দেখান। এর ফলে বিথোভেনের জীবনের গোপন দিক প্রকাশ্যে আসে।


বিথোভেনের কানে শোনার যন্ত্র ও হাতের লেখ। বিথোভেনের বাড়িতে সংরক্ষিত করা আছে।

চিত্র : অধ্যাপক গৌতম ঘোষ থেকে প্রাপ্ত 
©®
এই চিঠি মারফত জানতে পাওয়া যায়, বিথোভেন ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে সঙ্গীতে রূপ দেন, যা তৃতীয় (ইরোইকা), পঞ্চম ও ষষ্ঠ (পেস্টরাল) সিম্ফনিতে স্পষ্ট। এগুলোতে বিজয়ী, সাহসী ও প্রকৃতি-কেন্দ্রিক থিম দেখা যায়, যা আগের ক্লাসিক্যাল শৈলী থেকে ভিন্ন।

লুডভিগ ফ্যান ভিথোভেনের সিম্ফনি নং ৬ (এফ মেজর, অপাস ৬৮), পেস্টরাল নামে বিখ্যাত, ১৮০৭-০৮ সালে রচিত।  প্রকৃতির সৌন্দর্যের এক অনন্য সঙ্গীতমালা। এটি একটি প্রতিবেদনের জন্য আদর্শ বিষয়। এটি প্রকৃতির দৃশ্যাবলীকে চিত্রিত করে, যেমন গ্রামীণ আগমন, নদীর ধারে দৃশ্য, ঝড় এবং শান্তি। প্রথম প্রদর্শন ১৮০৮ সালে ভিয়েনায় হয়।

সিম্ফনির পাঁচটি আন্দোলন:
প্রথম: গ্রামে আগমনের আনন্দ (Allegro ma non troppo)।
দ্বিতীয়: নদীর ধারের দৃশ্য (Andante molto mosso), যেখানে পাখির ডাক শোনা যায়।
তৃতীয়: গ্রামবাসীদের আনন্দময় সমাবেশ (Allegro)।
চতুর্থ: ঝড় (Allegro)।
পঞ্চম: ঝড়ো পরবর্তী কৃতজ্ঞতা (Allegretto)।

অর্কেস্ট্রেশনে ব্যবহার হয়-
পিকোলো, ফ্লুট, ওবো, ক্ল্যারিনেট, ব্যাসুন, হর্ন, ট্রাম্পেট, ট্রম্বোন, টিম্পানি এবং স্ট্রিংস ব্যবহৃত। সময়কাল প্রায় ৪০ মিনিট।

ভিথোভেন এতে লিখেছেন, "এটি অনুভূতির প্রকাশ, ছবির আঁকা নয়।" এটি ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের অন্যতম প্রিয় রচনা।


বিথোভেনের চশমা 
চিত্র : অধ্যাপক গৌতম ঘোষ থেকে প্রাপ্ত। 
©®
বিথোভেন প্রকৃতিকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন এবং এটি তাঁর জীবনের একটি বড় অনুপ্রেরণা ছিল। তাই পেস্টরাল সিম্ফনিতে তিনি প্রকৃতির সৌন্দর্য ও শান্তিকে অনুভূতি হিসেবে প্রকাশ করেছেন। ভিয়েনার ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেতে বিথোভেন নিয়মিত গ্রামাঞ্চলে যেতেন, যেখানে তিনি সঙ্গীত রচনা করতেন। কানের সমস্যা (অন্ধকার) ও একাকিত্বের যন্ত্রণা থেকে প্রকৃতি তাঁকে সান্ত্বনা দিত, যা তাঁর চিঠিতে স্পষ্ট: "কেউ দেশকে আমার মতো ভালোবাসতে পারে না।" তিনি লিখেছেন, এটি "ছবি আঁকা নয়, অনুভূতির প্রকাশ"। গ্রামে আগমনের আনন্দ, নদীর ধার, ঝড় ও পরবর্তী কৃতজ্ঞতা—এসব মানুষের প্রকৃতি-অনুভূতিকে জাগায়। এটি সাধারণ শ্রোতাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা অনুসরণ করার জন্য। 

©® তাপসকুমারপাল 

Comments

Popular posts from this blog

একক বাদনের সুরে স্মরণে পণ্ডিত ভি. জি. যোগ

বৌদ্ধ মূর্তিতে কোঁকড়ানো চুলের রহস্য

টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার — কবিতা ও সঙ্গীত