নীল ষষ্ঠীতে কুমির
নীল ষষ্ঠীতে কুমির
তাপস কুমার পাল ©®
বাংলার সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতির ক্যানভাসে, যেখানে ১২ মাসে ১৩টি পার্বণের উদযাপন হয়ে থাকে, নীল ষষ্ঠী বা নীল পূজা এক অনন্য ও বিশেষ স্থান দখল করে রেখেছে। চৈত্র সংক্রান্তির ঠিক আগের দিন, ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষ ষষ্ঠী তিথিতে পালিত এই ব্রত মূলত মাতৃহৃদয়ের সন্তানপ্রেমের প্রকাশ—সন্তানদের দীর্ঘায়ু, সুস্থতা ও কল্যাণ কামনায় মায়েরা নিষ্ঠার সাথে এটি পালন করেন। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে নীলাদেবীর আরাধনা, ব্রতকর্ম এবং ফলাহারের মাধ্যমে এই পূজা সম্পন্ন হয়, যা পুরাণে নীলাদেবীকে সন্তানরক্ষকারিণী হিসেবে বর্ণিত করেছে।
তবে এই শাস্ত্রীয় রীতির সমান্তরালে বাংলার গ্রামীণ জনজীবনে এক অত্যন্ত প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় লৌকিক আচার প্রচলিত রয়েছে, যা 'কুমির পূজা' নামে পরিচিত। নদীমাতৃক বাংলায়, যেখানে গঙ্গা, পদ্মা, ধলেশ্বরী প্রভৃতি নদী জীবনের ধমনী, সেখানে জলজ প্রাণী কুমিরের প্রতি জনগণের ভয় ও ভক্তির দ্বৈত অনুভূতি ধর্মীয় আচারের রূপ নিয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে কুমিরকে নদীর রক্ষক বা গ্রামের দেবতা হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয়েছে; কখনো তার ক্রোধপ্রশান্তির জন্য পূজা, কখনো সহাবস্থানের প্রতীক হিসেবে। নীল ষষ্ঠীর কুমির পূজায় কুমিরের প্রতিমা বা প্রতীকী মূর্তি স্থাপন, নৈবেদ্য অর্পণ এবং মঙ্গলকামনা করা হয়—যা শাস্ত্রের সাথে লোকধর্মের অপূর্ব সংমিশ্রণের পরিচয় দেয়।
এই প্রথা বাংলার জলজীবনের সাথে গভীরভাবে জড়িত; দক্ষিণবঙ্গের সুন্দরবন থেকে উত্তরবঙ্গের নদীতীরবর্তী গ্রাম পর্যন্ত এর ছায়া পড়েছে। এটি কেবল একটি আচার নয়, বরং মানুষ-প্রকৃতির সম্পর্কের প্রতীক, যা ভয়কে ভক্তিতে রূপান্তরিত করে। এই লেখায় আমরা নীল ষষ্ঠীর এই লৌকিক মুখের ঐতিহ্য, রীতিনীতি, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের গভীরে প্রবেশ করব, যাতে এই প্রাচীন প্রথার আলোকবর্তিকা আজকের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়।
©®তাপসকুমারপাল
নীল চণ্ডিকা ও মহাদেবের গভীর সম্পর্ক
নীল চণ্ডিকা এবং মহাদেবের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, যা শাস্ত্রীয় পুরাণ এবং বাংলার লৌকিক লোককথার অপূর্ব মিশ্রণে প্রকাশ পায়। শাস্ত্রমতে, মহাদেব পরম পুরুষ এবং নীল চণ্ডিকা (বা দেবী নীলবতী) তাঁর আদ্যাশক্তি—পতি-পত্নীর রূপে শিব-শক্তির প্রতীক। দেবী দুর্গা বা পার্বতীর এক বিশেষ রূপ হিসেবে তাঁকে গণ্য করা হয়। যেমন শিবকে 'নীলকণ্ঠ' বলা হয় (যিনি সমুদ্রমন্থনের বিষ পান করে জগৎ রক্ষা করেছিলেন), তেমনি তাঁর শক্তি নীল চণ্ডিকা বা 'নীলী' নামে পরিচিত।
নীল পূজার সময় শিবকে নীলকণ্ঠ হিসেবে পূজা করা হয়, এবং নীল চণ্ডিকাকে মাতৃত্বের প্রতীক ও সন্তানরক্ষকারিণী হিসেবে দেখা হয়। লোকবিশ্বাসে, তিনি শিবের আরাধনার মাধ্যমে সন্তানদের রোগ-বালাই ও অমঙ্গল থেকে রক্ষা করেন। এই দৃষ্টান্ত বাংলার প্রাচীন লোকায়ত উৎসব নীল ষষ্ঠীর মূলে রয়েছে, যেখানে শিব-চণ্ডীর আরাধনার সাথে কুমির-সংশ্লিষ্ট লৌকিক আচার ও বিশ্বাস অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে প্রচলিত। এর মূল কারণ 'জলমাতা' বা জলের শক্তির প্রতি জনগণের ভীতি ও ভক্তির দ্বৈত অনুভূতি।
©®তাপসকুমারপাল
নীল ষষ্ঠীতে কুমির সংক্রান্ত একটা লৌকিক বিশ্বাসের
একটি লোকায়ত সমীক্ষা বাংলার গ্রামীণ লোকসংস্কৃতিতে নীল ষষ্ঠীর ব্রত কেবল উপবাস বা প্রদীপ প্রজ্জ্বলনেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে আদিম লৌকিক কিছু বিশ্বাস। বিশেষ করে গঙ্গা অববাহিকা বা নদীমাতৃক অঞ্চলে এই উৎসবে 'কুমির' একটি বিশেষ প্রতীকি ভূমিকা পালন করে।
ক. কাদার কুমির ও লৌকিক আচার
নীল ষষ্ঠীর দিন অনেক জায়গাতেই পুকুর ঘাটে বা নদীর পাড়ে কাদা দিয়ে কুমিরের মূর্তি তৈরি করা হয়। একে আঞ্চলিক ভাষায় 'কাদা-কুমির' বলা হয়। মহিলারা নীল পূজার অঙ্গ হিসেবে এই কাদার কুমিরের পিঠে সজনে ফুল, নিম পাতা এবং তিল-তুলসী অর্পণ করেন। কোনো কোনো অঞ্চলে ছোট ছোট বাঁশের কাঠি দিয়ে কুমিরের প্রতীকী দাঁত তৈরি করা হয়। আর পিঠে দেওয়া হয় তেঁতুলের দানা দিয়ে কাঁটা কাঁটা করা হয়।
©®তাপসকুমারপাল
কেন এই কুমির পূজা?
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কুমির হলো জলের অতল শক্তির রূপ। আগেকার দিনে নদী বা পুকুরে স্নান করতে গিয়ে কুমিরের কবলে পড়ার ভয় থাকত। সন্তানরা যাতে জলপথে বা স্নান করতে গিয়ে কোনো বিপদের সম্মুখীন না হয়, সেই কামনায় "জলমাতা" বা কুমিরের তুষ্টির জন্য এই আচার পালন করা হয়। এটি এক প্রকারের 'বিপদ-তারণ' বা 'বিপদ তারিণী' আচার। আর সন্তান রক্ষা ও উর্বরতার প্রতীক
নীল ষষ্ঠী মূলত সন্তানদের মঙ্গল কামনার ব্রত।
নৃতাত্ত্বিকদের মতে, কুমির পূজা কেবল ভীতি থেকে আসেনি, এটি উর্বরতার প্রতীকও বটে। কুমির প্রচুর ডিম পাড়ে এবং বংশবিস্তার করে, তাই লোকসমাজে একে বংশরক্ষার প্রতীক হিসেবেও গণ্য করা হয়। এছাড়া সজনে ফুল বা তিতো নিম পাতা ব্যবহারের মাধ্যমে ঋতু পরিবর্তনের সময় বসন্ত রোগ থেকে মুক্তির প্রার্থনাও এই আচারের সাথে যুক্ত থাকে।
অনেক গ্রামীণ ছড়ায় বা ব্রতকথায় উল্লেখ পাওয়া যায় যে, নীল ঠাকুরের আশীর্বাদে যেমন সন্তান লাভ হয়, তেমনই প্রকৃতির রুদ্র রূপ (কুমির) যাতে সেই সন্তানকে স্পর্শ না করে, তার জন্যই এই বিশেষ প্রার্থনা।
কুমিরকে পুজো করার সময় অনেক অঞ্চলে বিশেষ ছড়া কাটা হয়। মায়েরা প্রার্থনা করেন— "কুমির যেমন নিজের সন্তানকে আগলে রাখে, বাবা নীলকণ্ঠ যেন সেভাবেই আমার সন্তানকে রক্ষা করেন।"
©®তাপসকুমারপাল
নীল ষষ্ঠী বা নীল পূজা মূলত একটি খাঁটি বাঙালি উৎসব। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ভারতের অন্যান্য রাজ্য এবং প্রতিবেশী দেশে যেখানে বাঙালি হিন্দুরা বসবাস করেন, সেখানেই এই ব্রত অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালিত হয়।
পশ্চিমবঙ্গের বাইরে নীল ষষ্ঠী পালনের প্রধান অঞ্চলগুলো হলো:
▪️ত্রিপুরা:পশ্চিমবঙ্গের পর ত্রিপুরাতেই সবথেকে বড় আকারে নীল ষষ্ঠী ও চৈত্র গাজন পালিত হয়। আগরতলা থেকে শুরু করে উদয়পুর বা কৈলাশহরের মতো এলাকায় বাঙালি অধুষ্যিত গ্রামগুলিতে মায়েরা উপবাস থেকে শিবের মাথায় জল ঢালেন।
▪️অসম (বরাক উপত্যকা): অসমের বরাক উপত্যকার জেলাগুলো (যেমন- শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি) যেখানে বড় সংখ্যক বাঙালি বাস করেন, সেখানে নীল ষষ্ঠীর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।
▪️ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা (সীমান্তবর্তী এলাকা): পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম এবং ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ বা বালেশ্বরের কিছু অংশে, যেখানে বাঙালি লোকসংস্কৃতির প্রভাব রয়েছে, সেখানে নীল ষষ্ঠী পালন করতে দেখা যায়।
▪️বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা: ভারতের বাইরে বাংলাদেশেও নীল পূজা অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে ঢাকা, শাঁখারী বাজার, মানিকগঞ্জ, বরিশাল, ময়মনসিংহ এবং দিনাজপুরে এই দিনটিতে শিবের মন্দিরে ব্যাপক ভিড় হয়। সেখানে 'নীল বাতি' জ্বালানোর এবং শিবের গাজন করার ঐতিহ্য খুবই প্রাচীন।
▪️প্রবাসী বাঙালি সমাজ:বর্তমানে ভারতের বাইরেও (যেমন- দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু) যেখানে প্রবাসী বাঙালিরা সংঘবদ্ধভাবে থাকেন, সেখানেও শিব মন্দিরে নীল ষষ্ঠীর উপবাস পালন করা হয়।
একটি মজার তথ্য না জানালেও নয়, তাহলো,
নীল ষষ্ঠীর সাথে যুক্ত 'গাজন' বা 'চড়ক পূজা'-র মতো উৎসব ভারতের অন্যান্য কিছু রাজ্যে ভিন্ন নামে পালিত হয়। যেমন:
মহারাষ্ট্রে:একে বলা হয় বাগাড' (Bagad)।
অন্ধ্রপ্রদেশে: একই ধরণের একটি উৎসবকে বলা হয় 'সিরিমানু উৎসবম' (Sirimanu Utsavam)।
তবে মায়েদের উপবাস রেখে শিবের পুজো করা এবং সন্তানের মঙ্গল কামনায় নীল বাতি জ্বালানোর যে বিশেষ রীতি, তা মূলত বাঙালি সংস্কৃতিরই এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।
নীল ষঠীর কুমির পূজা বাঙালির ধর্মবিশ্বাসের বিস্তৃততা প্রমাণ করে—যা মন্দিরের চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রকৃতি, জলবায়ু এবং দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই লৌকিক আচার আসলে মানুষের প্রকৃতির কাছে বিনম্র আত্মসমর্পণের প্রতীক, যেখানে জলজ কুমিরকে ভয়ের সাথে ভক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়।
বর্তমান নগরায়নের যুগে শহরাঞ্চলে 'কাদা-কুমির' গড়ার রীতি প্রায় বিলুপ্ত হতে চললেও—পুকুর ভরাট এবং যান্ত্রিক জীবনের চাপে শৈল্পিক-আধ্যাত্মিক সংযোগ হারিয়ে যাচ্ছে—পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া, বীরভূম, পূর্ব-পশ্চিম মেদিনীপুর এবং বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে এটি নিষ্ঠার সাথে টিকে আছে। আজও গ্রামের পুকুরঘাটে নীল ষষ্ঠীর বিকেলে মহিলারা কাদার কুমির সাজিয়ে ব্রতকথা শোনেন, যা বাঙালির আদিম প্রকৃতি-চেতনা এবং সন্তানদের প্রতি মাতৃহৃদয়ের চিরন্তন আশঙ্কার সুন্দর বহিঃপ্রকাশ।
এই প্রাচীন প্রথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আধুনিকতার দৌড়ে লোকসংস্কৃতির এই জীবন্ত সুতোকে সংরক্ষণ করা কতটা জরুরি। নীল ষষ্ঠীর কুমির পূজা শুধু একটি আচার নয়, বরং আমাদের মাতৃভূমির জল-সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের চিরস্থায়ী সাক্ষ্য।
তাপস কুমার পাল ©®
বাংলার সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতির ক্যানভাসে, যেখানে ১২ মাসে ১৩টি পার্বণের উদযাপন হয়ে থাকে, নীল ষষ্ঠী বা নীল পূজা এক অনন্য ও বিশেষ স্থান দখল করে রেখেছে। চৈত্র সংক্রান্তির ঠিক আগের দিন, ফাল্গুন মাসের শুক্লপক্ষ ষষ্ঠী তিথিতে পালিত এই ব্রত মূলত মাতৃহৃদয়ের সন্তানপ্রেমের প্রকাশ—সন্তানদের দীর্ঘায়ু, সুস্থতা ও কল্যাণ কামনায় মায়েরা নিষ্ঠার সাথে এটি পালন করেন। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে নীলাদেবীর আরাধনা, ব্রতকর্ম এবং ফলাহারের মাধ্যমে এই পূজা সম্পন্ন হয়, যা পুরাণে নীলাদেবীকে সন্তানরক্ষকারিণী হিসেবে বর্ণিত করেছে।
তবে এই শাস্ত্রীয় রীতির সমান্তরালে বাংলার গ্রামীণ জনজীবনে এক অত্যন্ত প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় লৌকিক আচার প্রচলিত রয়েছে, যা 'কুমির পূজা' নামে পরিচিত। নদীমাতৃক বাংলায়, যেখানে গঙ্গা, পদ্মা, ধলেশ্বরী প্রভৃতি নদী জীবনের ধমনী, সেখানে জলজ প্রাণী কুমিরের প্রতি জনগণের ভয় ও ভক্তির দ্বৈত অনুভূতি ধর্মীয় আচারের রূপ নিয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে কুমিরকে নদীর রক্ষক বা গ্রামের দেবতা হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয়েছে; কখনো তার ক্রোধপ্রশান্তির জন্য পূজা, কখনো সহাবস্থানের প্রতীক হিসেবে। নীল ষষ্ঠীর কুমির পূজায় কুমিরের প্রতিমা বা প্রতীকী মূর্তি স্থাপন, নৈবেদ্য অর্পণ এবং মঙ্গলকামনা করা হয়—যা শাস্ত্রের সাথে লোকধর্মের অপূর্ব সংমিশ্রণের পরিচয় দেয়।
এই প্রথা বাংলার জলজীবনের সাথে গভীরভাবে জড়িত; দক্ষিণবঙ্গের সুন্দরবন থেকে উত্তরবঙ্গের নদীতীরবর্তী গ্রাম পর্যন্ত এর ছায়া পড়েছে। এটি কেবল একটি আচার নয়, বরং মানুষ-প্রকৃতির সম্পর্কের প্রতীক, যা ভয়কে ভক্তিতে রূপান্তরিত করে। এই লেখায় আমরা নীল ষষ্ঠীর এই লৌকিক মুখের ঐতিহ্য, রীতিনীতি, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক তাৎপর্যের গভীরে প্রবেশ করব, যাতে এই প্রাচীন প্রথার আলোকবর্তিকা আজকের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়।
©®তাপসকুমারপাল
নীল চণ্ডিকা ও মহাদেবের গভীর সম্পর্ক
নীল চণ্ডিকা এবং মহাদেবের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, যা শাস্ত্রীয় পুরাণ এবং বাংলার লৌকিক লোককথার অপূর্ব মিশ্রণে প্রকাশ পায়। শাস্ত্রমতে, মহাদেব পরম পুরুষ এবং নীল চণ্ডিকা (বা দেবী নীলবতী) তাঁর আদ্যাশক্তি—পতি-পত্নীর রূপে শিব-শক্তির প্রতীক। দেবী দুর্গা বা পার্বতীর এক বিশেষ রূপ হিসেবে তাঁকে গণ্য করা হয়। যেমন শিবকে 'নীলকণ্ঠ' বলা হয় (যিনি সমুদ্রমন্থনের বিষ পান করে জগৎ রক্ষা করেছিলেন), তেমনি তাঁর শক্তি নীল চণ্ডিকা বা 'নীলী' নামে পরিচিত।
নীল পূজার সময় শিবকে নীলকণ্ঠ হিসেবে পূজা করা হয়, এবং নীল চণ্ডিকাকে মাতৃত্বের প্রতীক ও সন্তানরক্ষকারিণী হিসেবে দেখা হয়। লোকবিশ্বাসে, তিনি শিবের আরাধনার মাধ্যমে সন্তানদের রোগ-বালাই ও অমঙ্গল থেকে রক্ষা করেন। এই দৃষ্টান্ত বাংলার প্রাচীন লোকায়ত উৎসব নীল ষষ্ঠীর মূলে রয়েছে, যেখানে শিব-চণ্ডীর আরাধনার সাথে কুমির-সংশ্লিষ্ট লৌকিক আচার ও বিশ্বাস অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে প্রচলিত। এর মূল কারণ 'জলমাতা' বা জলের শক্তির প্রতি জনগণের ভীতি ও ভক্তির দ্বৈত অনুভূতি।
©®তাপসকুমারপাল
নীল ষষ্ঠীতে কুমির সংক্রান্ত একটা লৌকিক বিশ্বাসের
একটি লোকায়ত সমীক্ষা বাংলার গ্রামীণ লোকসংস্কৃতিতে নীল ষষ্ঠীর ব্রত কেবল উপবাস বা প্রদীপ প্রজ্জ্বলনেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে আদিম লৌকিক কিছু বিশ্বাস। বিশেষ করে গঙ্গা অববাহিকা বা নদীমাতৃক অঞ্চলে এই উৎসবে 'কুমির' একটি বিশেষ প্রতীকি ভূমিকা পালন করে।
ক. কাদার কুমির ও লৌকিক আচার
নীল ষষ্ঠীর দিন অনেক জায়গাতেই পুকুর ঘাটে বা নদীর পাড়ে কাদা দিয়ে কুমিরের মূর্তি তৈরি করা হয়। একে আঞ্চলিক ভাষায় 'কাদা-কুমির' বলা হয়। মহিলারা নীল পূজার অঙ্গ হিসেবে এই কাদার কুমিরের পিঠে সজনে ফুল, নিম পাতা এবং তিল-তুলসী অর্পণ করেন। কোনো কোনো অঞ্চলে ছোট ছোট বাঁশের কাঠি দিয়ে কুমিরের প্রতীকী দাঁত তৈরি করা হয়। আর পিঠে দেওয়া হয় তেঁতুলের দানা দিয়ে কাঁটা কাঁটা করা হয়।
©®তাপসকুমারপাল
কেন এই কুমির পূজা?
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কুমির হলো জলের অতল শক্তির রূপ। আগেকার দিনে নদী বা পুকুরে স্নান করতে গিয়ে কুমিরের কবলে পড়ার ভয় থাকত। সন্তানরা যাতে জলপথে বা স্নান করতে গিয়ে কোনো বিপদের সম্মুখীন না হয়, সেই কামনায় "জলমাতা" বা কুমিরের তুষ্টির জন্য এই আচার পালন করা হয়। এটি এক প্রকারের 'বিপদ-তারণ' বা 'বিপদ তারিণী' আচার। আর সন্তান রক্ষা ও উর্বরতার প্রতীক
নীল ষষ্ঠী মূলত সন্তানদের মঙ্গল কামনার ব্রত।
নৃতাত্ত্বিকদের মতে, কুমির পূজা কেবল ভীতি থেকে আসেনি, এটি উর্বরতার প্রতীকও বটে। কুমির প্রচুর ডিম পাড়ে এবং বংশবিস্তার করে, তাই লোকসমাজে একে বংশরক্ষার প্রতীক হিসেবেও গণ্য করা হয়। এছাড়া সজনে ফুল বা তিতো নিম পাতা ব্যবহারের মাধ্যমে ঋতু পরিবর্তনের সময় বসন্ত রোগ থেকে মুক্তির প্রার্থনাও এই আচারের সাথে যুক্ত থাকে।
অনেক গ্রামীণ ছড়ায় বা ব্রতকথায় উল্লেখ পাওয়া যায় যে, নীল ঠাকুরের আশীর্বাদে যেমন সন্তান লাভ হয়, তেমনই প্রকৃতির রুদ্র রূপ (কুমির) যাতে সেই সন্তানকে স্পর্শ না করে, তার জন্যই এই বিশেষ প্রার্থনা।
কুমিরকে পুজো করার সময় অনেক অঞ্চলে বিশেষ ছড়া কাটা হয়। মায়েরা প্রার্থনা করেন— "কুমির যেমন নিজের সন্তানকে আগলে রাখে, বাবা নীলকণ্ঠ যেন সেভাবেই আমার সন্তানকে রক্ষা করেন।"
©®তাপসকুমারপাল
নীল ষষ্ঠী বা নীল পূজা মূলত একটি খাঁটি বাঙালি উৎসব। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ভারতের অন্যান্য রাজ্য এবং প্রতিবেশী দেশে যেখানে বাঙালি হিন্দুরা বসবাস করেন, সেখানেই এই ব্রত অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালিত হয়।
পশ্চিমবঙ্গের বাইরে নীল ষষ্ঠী পালনের প্রধান অঞ্চলগুলো হলো:
▪️ত্রিপুরা:পশ্চিমবঙ্গের পর ত্রিপুরাতেই সবথেকে বড় আকারে নীল ষষ্ঠী ও চৈত্র গাজন পালিত হয়। আগরতলা থেকে শুরু করে উদয়পুর বা কৈলাশহরের মতো এলাকায় বাঙালি অধুষ্যিত গ্রামগুলিতে মায়েরা উপবাস থেকে শিবের মাথায় জল ঢালেন।
▪️অসম (বরাক উপত্যকা): অসমের বরাক উপত্যকার জেলাগুলো (যেমন- শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি) যেখানে বড় সংখ্যক বাঙালি বাস করেন, সেখানে নীল ষষ্ঠীর ব্যাপক প্রচলন রয়েছে।
▪️ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা (সীমান্তবর্তী এলাকা): পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম এবং ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ বা বালেশ্বরের কিছু অংশে, যেখানে বাঙালি লোকসংস্কৃতির প্রভাব রয়েছে, সেখানে নীল ষষ্ঠী পালন করতে দেখা যায়।
▪️বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা: ভারতের বাইরে বাংলাদেশেও নীল পূজা অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে ঢাকা, শাঁখারী বাজার, মানিকগঞ্জ, বরিশাল, ময়মনসিংহ এবং দিনাজপুরে এই দিনটিতে শিবের মন্দিরে ব্যাপক ভিড় হয়। সেখানে 'নীল বাতি' জ্বালানোর এবং শিবের গাজন করার ঐতিহ্য খুবই প্রাচীন।
▪️প্রবাসী বাঙালি সমাজ:বর্তমানে ভারতের বাইরেও (যেমন- দিল্লি, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু) যেখানে প্রবাসী বাঙালিরা সংঘবদ্ধভাবে থাকেন, সেখানেও শিব মন্দিরে নীল ষষ্ঠীর উপবাস পালন করা হয়।
একটি মজার তথ্য না জানালেও নয়, তাহলো,
নীল ষষ্ঠীর সাথে যুক্ত 'গাজন' বা 'চড়ক পূজা'-র মতো উৎসব ভারতের অন্যান্য কিছু রাজ্যে ভিন্ন নামে পালিত হয়। যেমন:
মহারাষ্ট্রে:একে বলা হয় বাগাড' (Bagad)।
অন্ধ্রপ্রদেশে: একই ধরণের একটি উৎসবকে বলা হয় 'সিরিমানু উৎসবম' (Sirimanu Utsavam)।
তবে মায়েদের উপবাস রেখে শিবের পুজো করা এবং সন্তানের মঙ্গল কামনায় নীল বাতি জ্বালানোর যে বিশেষ রীতি, তা মূলত বাঙালি সংস্কৃতিরই এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।
নীল ষঠীর কুমির পূজা বাঙালির ধর্মবিশ্বাসের বিস্তৃততা প্রমাণ করে—যা মন্দিরের চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রকৃতি, জলবায়ু এবং দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই লৌকিক আচার আসলে মানুষের প্রকৃতির কাছে বিনম্র আত্মসমর্পণের প্রতীক, যেখানে জলজ কুমিরকে ভয়ের সাথে ভক্তিতে রূপান্তরিত করা হয়।
বর্তমান নগরায়নের যুগে শহরাঞ্চলে 'কাদা-কুমির' গড়ার রীতি প্রায় বিলুপ্ত হতে চললেও—পুকুর ভরাট এবং যান্ত্রিক জীবনের চাপে শৈল্পিক-আধ্যাত্মিক সংযোগ হারিয়ে যাচ্ছে—পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া, বীরভূম, পূর্ব-পশ্চিম মেদিনীপুর এবং বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে এটি নিষ্ঠার সাথে টিকে আছে। আজও গ্রামের পুকুরঘাটে নীল ষষ্ঠীর বিকেলে মহিলারা কাদার কুমির সাজিয়ে ব্রতকথা শোনেন, যা বাঙালির আদিম প্রকৃতি-চেতনা এবং সন্তানদের প্রতি মাতৃহৃদয়ের চিরন্তন আশঙ্কার সুন্দর বহিঃপ্রকাশ।
এই প্রাচীন প্রথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আধুনিকতার দৌড়ে লোকসংস্কৃতির এই জীবন্ত সুতোকে সংরক্ষণ করা কতটা জরুরি। নীল ষষ্ঠীর কুমির পূজা শুধু একটি আচার নয়, বরং আমাদের মাতৃভূমির জল-সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের চিরস্থায়ী সাক্ষ্য।
©®তাপসকুমারপাল
Comments